প্রশ্নোত্তরে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (NRC) ও নাগরিকত্ব বিল (CAB)

প্রশ্নোত্তরে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (NRC) ও নাগরিকত্ব বিল (CAB)

“নিজের দেশে রিফিউজি হব? প্রশ্নোত্তরে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (NRC) ও নাগরিকত্ব বিল (CAB)” – প্রকাশক পিপল্‌স স্টাডি সার্কেল (‘নভেম্বর ২০১৯’) থেকে কিছু অংশ—

পশ্চিমবাংলায় অথবা দেশজুড়ে এনআরসি প্রক্রিয়া কি শুরু হয়ে গেছে?

গত ৩১শে জুলাই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক একটি গেজেট নোটিশের মাধ্যমে ২০২০-র ১লা এপ্রিল থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে আসাম বাদে বাকি ভারতীয় রাজ্যগুলিতে কেন্দ্রীয় জনসংখ্যাপঞ্জি বা ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার (NPR) তৈরি করার কথা জানিয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরকারি আধিকারিকরা নাম, ঠিকানা, বয়েস, জন্মস্থান, পরিবারের বিবরণ ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করবে। ২০০৩-এর নাগরিকত্ব বিধির অধীনে এই গেজেট নোটিশ জারি করা হয়েছে।

২০০৩-এর নাগরিকত্ব বিধি অনুযায়ী এনপিআর তৈরি করার পরের ধাপে কোনও বাসিন্দার নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ হলে স্থানীয় আধিকারিক তাকে নোটিশ পাঠিয়ে তার নথিপত্র যাচাই করবে। আবেদন লিখে আধিকারিকদের সন্দেহ দূর করতে না পারলে এনপিআর তালিকা থেকে সেই “সন্দেহভাজন নাগরিক”-দের (ডাউটফুল সিটিজেন) নাম বাদ দিয়ে নাগরিকপঞ্জি তৈরি হবে। এভাবে ধাপে ধাপে দেশজুড়ে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি অর্থাৎ ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিটিজেনস (NRIC) তৈরি করা হবে। সেই নয়া তালিকা অনুযায়ী সব নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড) দেওয়া হবে। এক কথায়, “এনপিআর – সন্দেহভাজন নাগরিক = এনআরআইসি”। তার মানে এই গেজেট নোটিশ অনুযায়ী সামনের বছরের ১লা এপ্রিল থেকেই গোটা প্রক্রিয়াটা শুরু হতে চলেছে।

……

২০০৩-এর নাগরিকত্ব বিধিটা কীভাবে তৈরি হল? এ ব্যাপারে একটু খুলে বলবেন?

২০০৩-এর নাগরিকত্ব বিধি তৈরি করা হয়েছে অটল বিহারি বাজপেয়ির জমানায় বানানো আপাদমস্তক উদ্বাস্তু-বিরোধী ২০০৩-এর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের ভিত্তিতে। এই একুশে আইনটা উদ্বাস্তু খেদানোর জন্য তৈরি করা একটি অ্যাটম বোমা। এই আইনেই প্রথমবার “বেআইনি অভিবাসী” (ইল্‌লিগ্যাল মাইগ্রেন্ট) শব্দটা আনা হয়। এই আইনটাতে একটা নয়, একেবারে তিন তিনটে ফাঁদ পাতা হয়েছিল উদ্বাস্তুদের জন্য।
প্রথম ফাঁদ। একুশে আইনটার ২(বি)(১) ধারায় লেখা হল যে যাঁরা পাসপোর্ট ছাড়া আসবেন অথবা ভিসার মেয়াদ ফুরোনোর পর এ দেশে থাকবেন, তারা সবাই “বেআইনি অভিবাসী”। ভেবে দেখুন যে বন্যা, খরা, দারিদ্র, হিংসা, দেশভাগ, দাঙ্গা থেকে জান বাঁচাতে পালিয়ে আসা মানুষদের পক্ষে কি আদৌ সম্ভব পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে আসা? এই মারাত্মক আইনি ফাঁদ পেতে বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তুকে “অবৈধ অভিবাসী” বলে দেওয়া হল।

দ্বিতীয় ফাঁদ। এর আগে অবধি আইন ছিল যে যাঁরা ভারতে জন্মেছেন তাঁদের মা-বাবার মধ্যে কেউ একজন ভারতীয় হলেই তিনি জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক হসেবে গণ্য হতেন। কিন্তু ২০০৩-এর একুশে আইনটার ৩(সি)(১) ধারায় এটা পালটে একটা মারাত্মক শর্ত ঢোকানো হয়েছে। বলা হয়েছে যে সন্তান ভারতে জন্মগ্রহণ করলেও মা-বাবার মধ্যে যে কোনও একজনও যদি ওপরের সংজ্ঞা অনুযায়ী “বেআইনি অভিবাসী” হন, তাহলে সে সন্তানকেও ভারতের নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে না। এর ফলে বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু পরিবারের যে সন্তানরা ভারতের মাটিতে জন্মেছে তাদের নাগরিকত্বের অধিকার নস্যাৎ করা হল।

তৃতীয় ফাঁদটার কথা আগেই বলেছি। জাতীয় নাগরিকপঞ্জি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফাঁদ। এটা পাতা হয়েছে একুশে আইন মোতাবেক ১৪(এ) ধারায়। বলা হয়েছে যে কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে দেশজুড়ে পঞ্জিকরণ করিয়ে সব নাগরিকদের “জাতীয় পরিচয়পত্র” বানানো বাধ্যতামূলক করতে পারে। অর্থাৎ, জনগণ চান বা না চান, তাঁদের ঘাড় ধরে একটি রাষ্ট্রীয় নিমন্ত্রণপত্র সহযোগে নাগরিকপঞ্জির সাথে তার অশুভ পরিণয় সম্পন্ন করা যেতেই পারে।

ফাঁদ পাতা সার্থক হয়েছে। আসামে ১৯ লক্ষ মানুষ বে-নাগরিক হয়েছেন। দেশজুড়ে এনআরসি প্রক্রিয়া করার আইনি জমি তৈরি করা হয়েছে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে ২০০৩ সালের আইন যখন পাশ হয়, তখন সংসদে কোনও রাজনৈতিক দলই বিশেষ বিরোধিতা করেনি। আজকে উদ্বাস্তুদের প্রতি মমতায়, স্নেহে, আদরে যাদের ঘুম হয় না তাঁরাও সে সময়ে এই আইনি মারপ্যাঁচের খেলা দু’চোখ এবং হৃদয় ভরে উপভোগ করেছেন। অল্প কিছু সংখ্যাক নেতারা উদ্বাস্তুদের কী হবে বলে কয়েকটি প্রশ্ন তুলেছিলেন বটে, তবে এই আইনের বিরুদ্ধে ভোটাভুটি বা গণপ্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন নি।

সুতরাং ২০০৩-এর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের “অবৈধ অভিবাসী” এবং ২০০৩-এর নাগরিকত্ব বিধির “সন্দেহজনক নাগরিক” – বিজেপি-র এই দু’টো আইনি প্যাঁচে যাঁরা আজ নিজেদের নাগরিক অধিকার খোয়াতে চলেছেন, অমিত শাহ এবং দিলীপ ঘোষের মত বিজেপি নেতারা তাঁদের বিরুদ্ধে “উইপোকা” আর “অনুপ্রবেশকারী” বলে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন।

………

তার মানে সিএবি (ক্যাব) বিল সমস্ত হিন্দু উদ্বাস্তুদের ভারতীয় নাগরিক বানিয়ে দেবে?

ভুল প্রচার। সিএবি (ক্যাব) বিল কাউকেই সরাসরি নাগরিকত্ব দেবে না। অন্যের মুখের কথা না শুনে নিজে সরকারের পাতা থেকে ডাইনলোড করে পড়ে দেখুন। বিল কী বলছে? বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুদের “অবৈধ অভিবাসী” অর্থাৎ বিদেশি হিসেবে গণ্য করা হবে না, শরণার্থী হিসেবে দেখা হবে। এটুকুই বিলের বক্তব্য। ধরে নিলাম সংসদে বিল পাশ হল, ধরে নিলাম বিল আইনও হয়ে গেল। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বাংলাদেশ থেকে এতদিন ধরে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুরা সঙ্গে সঙ্গে ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন। তাঁরা শরণার্থী হিসেবে ভারতে থাকার আইনি সুরক্ষা পাবেন, এইটুকু। তাঁদের পুলিশ তক্ষুণি জেলে পুরে দেবে না বা বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেবে না।

কিন্তু নাগরিকত্ব পেতে হলে আপনাকে প্রমাণ দিতে হবে আপনি ধর্মীয় কারণে নিপীড়িত হয়ে ভারতে এসেছেন। ধরা যাক, আপনার পরিবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৯৬৫ সালে এসেছিল। ১৯৬৫-এর পর ৫৪ বছর চলে গেছে। এত বছর পর প্রমাণ করতে পারবেন যে ৫৪ বছর আগে পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মের কারণে অত্যাচারিত হয়েছিলেন? মানুষ তো এদেশে নানা কারণে এসেছেন। অনেকেই চাকরি বা রোজগারের কারণে এসেছেন। অনেকেই জ্ঞাতি-গুষ্টি বা গ্রামের লোক চলে আসাতে এসেছেন। অনেকে এসেছেন দাঙ্গার কারণে। অনেকে এসেছেন ভয়ে। অনেকে এসেছেন নিরাপত্তার খোঁজে। অনেকে সরাসরি নিপীড়িত হয়েও এসেছেন। কিন্তু সেই অত্যাচারের সেলফি অথবা লাইভ ভিডিও তুলে ফেসবুকে তো আপলোড করে রাখেননি। সে সময়ে থানায় ডায়েরি তো করেননি। কীসের প্রমাণ দেবেন? দ্বিতীয় কথা হল এই যে আপনাকে নাগরিকত্বের জন্য ছ’বছর পর আলাদা আবেদন করতে হবে। সেই আবেদন সরকার খারিজও করতে পারে।

তার মানে কী দাঁড়াল, একবার ভেবে দেখুন। এতদিন আপনি ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড, বিপিএল কার্ড ইত্যাদি এতগুলো কাগজের সাহায্যে ন্যূনতম নাগরিক অধিকারটুকু পাচ্ছিলেন। বিলের এক খোঁচায় নাগরিক থেকে শরণার্থী হবেন। তারপর ছ’বছর পর নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবার ভিক্ষে করতে যাবেন সরকারের কাছে। এ এক বিরাট ধাপ্পা। এতে হিন্দু উদ্বাস্তুদের চরম ক্ষতি আর নাগরিক অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়া ছাড়া আর কিছু নেই।

তাহলে মোদী সরকার সিএবি (ক্যাব) বিল পাশ করাতে চাইছে কেন?

সিএবি (ক্যাব) বিল পাশ করানোর একটাই উদ্দেশ্য। গোটা দেশে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিভেদ আর মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি করা। এই বিলে যেভাবে ইসলাম বাদ দিয়ে সমস্ত ধর্মের নাম নেওয়া হয়েছে, সেটা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান বিরোধী। মানুষে মানুষে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা কানুন করা যাবে না এটা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের মৌলিক কথা। এর উল্টোদিকে হেঁটে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করার আইন বানানো চলে না।

কেন্দ্রীয় সরকার যদি সত্যিই আমাদের পড়শি দেশগুলির সমস্ত নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের শরণার্থী হিসেবে ভারতের নাগরিকত্ব দিতে উদ্যোগী হত, তাহলে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানে থাকা আহমদী, সুফি সহ সংখ্যালঘু বা গৌণধর্মের যে মুসলমান গোষ্ঠীগুলি আছে, তাঁদের কথাও বিলে রাখত। যে নাস্তিকরা ধর্ম বিশ্বাস করেন না বলে সারা উপমহাদেশ জুড়ে আক্রান্ত, যে মুক্তমনা-রা ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার, তাঁদের কথাও বিলে থাকত। তাছাড়া এই বিলে মায়ানমার (বার্মা), নেপাল, ভূটান আর শ্রীলঙ্কার নাম বাদ কেন? কারণটা সহজ। মায়ানমারে রোহিঙ্গারা আক্রান্ত এবং তাঁরা মুসলমান। আক্রমণকারীরা বৌদ্ধ। নেপাল বা ভুটান থেকে যে গোর্খারা এসেছেন তাঁদের ক্ষেত্রেও মুসলমানদের আক্রমণকারী হিসেবে দেখানো যাবে না। তাই এই দেশগুলি বাদ।

তাছাড়া, ভারতের পড়শি দেশগুলিতে সংখ্যালঘু নিপীড়ন শুধুই ধর্মের নামে হয় না, ভাষা বা জাতিগত কারণেও হয়। যেমন শ্রীলঙ্কা থেকে নিপীড়িত হয়ে অনেক তামিল উদ্বাস্তুরা ভারতে এসেছেন। তাঁদের এই আইনের আওতায় আনা হয় নি কেন? বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও রাজাকার বাহিনী যে অত্যাচার চালিয়েছিল, সেটা তো ধর্মের ভিত্তিতে ছিল না। ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালিদের ওপর দমন হয়েছিল এবং বাঙালি মুসলমানেরা চরম নিপীড়নের শিকার হন। সে অত্যাচার থেকে পালিয়ে কোনও বাঙালি মুসলমান যদি ভারতে এসে আশ্রয় নিয়ে থাকেন, তাহলে তিনিও শরণার্থীর মর্যাদা পাবেন না কেন?

বোঝাই যাচ্ছে যে বিজেপি সরকার তার সাম্প্রদায়িক মুসলিম-বিদ্বেষী মতাদর্শ অনুসারেই এই বিলটা নিয়ে এসেছে। গরিব হিন্দু উদ্বাস্তুদের মিথ্যে আশা দিয়ে ঠকিয়ে বিষাক্ত হিন্দু-মুসলমান বিভাজন তৈরির কল ছাড়া এই বিলকে আর কী বলবেন?

বিজেপি বলছে এগুলো বিরোধীদের অপপ্রচার। সিএবি (ক্যাব) বিল দিয়ে যে হিন্দু উদ্বাস্তুদের কোনও উপকার হবে না তার সরকারি প্রমাণ আছে?

প্রমাণ আছে। ২০১৬-র ক্যাব বিল নিয়ে একটি যৌথ সংসদীয় কমিটি (জেপিসি) আড়াই বছর ধরে আলাপ-আলোচনা এবং বিতর্ক চালিয়েছিল। বিতর্কে বিরোধী দলেরা নানা রকম প্রশ্ন করে, কেন্দ্রীয় সরকার তার জবাব দেয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সমস্তটা নিয়ে জেপিসি রিপোর্ট সংসদে পেশ হয়।

এই জেপিসি রিপোর্টের ৩৯ এবং ৪০ পাতার প্রতিটি বাক্যে যেন উদ্বাস্তুদের দুর্ভাগ্য জ্বলন্ত অক্ষরে লেখা। সরকারকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে কীভাবে নাগরিকত্ব আবেদনের সত্যি-মিথ্যে যাচাই করা হবে, আর কোন উদ্বাস্তুরা এই আইনের সুবিধে পাবেন? তারা জবাব দেয় যে এ দেশে আসার আগে থেকেই যে উদ্বাস্তুরা জানিয়ে রেখেছেন যে তাঁরা অত্যাচারিত হয়ে পালিয়ে এসেছেন এবং যাঁদের লং টার্ম ভিসা দেওয়া হয়েছে, শুধুমাত্র তাঁদেরকেই এই আইনের সুবিধে দেওয়া হবে। নতুন করে এখন যাঁরা নিজেদের অত্যাচারিত হওয়ার ইতিহাস জানাবেন, তাঁদের কেসগুলো ইনটেলিজেন্স বুরো এবং রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং বা “র” (RAW)-এর গোয়েন্দারা খতিয়ে দেখবেন। এই আধিকারিকদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে মোট কতজন মানুষ এই আইনের সাহায্যে নাগরিকত্ব পেতে পারেন? তাদের জবাব, “হিন্দু – ২৫,৪৪৭, শিখ – ৫,৮০৭, খ্রিস্টান – ৫৫, বৌদ্ধ – ২, পার্সি -২, সব মিলিয়ে সারা দেশে ৩১,৩১৩ জন”। এটা আমাদের কথা নয়, সরকারের জবাব। জেপিসি কমিটির সদস্যরা আইন বিভাগের আমলা-মন্ত্রীদের জিজ্ঞেস করেছিলেন যে দেশজুড়ে শুধুমাত্র ৩১,৩১৩ জন মানুষ এই আইনের উপকৃতের আওতায় আসবেন, না সংখ্যাটা পরে বদলাতেও পারে? এতে সরকারের জবাব, মোট ওই ৩১,৩১৩ জনকেই নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। বাকিদের বরং বিদেশি ট্রাইবুনাল এর সামনে হাজিরা দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কাগজ নকল করে নাগরিকত্ব পান নি।

তার মানে যদি সিএবি (ক্যাব) বিল পাশ হয়, তাহলে সারা ভারতে মাত্র ৩১,৩১৩ জন উদ্বাস্তু এখন নাগরিকত্ব পাবেন। আর ২০০৩-এর একুশে আইনটার ফাঁদে বানানো এনআরসি-র ছাঁকনিতে যে ১৯ লক্ষ মানুষ আসামের নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, তাঁদের জন্য কাঁচকলা। এছাড়া নতুন করে যে মানুষেরা ২০০৩ আইনের “বেআইনি অভিবাসী”-র ফাঁদে পড়ে নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়বেন, তাদের জন্যও কাঁচকলা। তাঁদের ভাগ্যে থাকবে ট্রাইবুনাল, কোর্টকাছারি, ডিটেনশন ক্যাম্প আর আবেদন-নিবেদন।

তাহলে নাগরিকপঞ্জি বা ক্যাব করে কোনও লাভ নেই। কয়েকজন অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়লেও তাদের বাংলাদেশে পাঠানো সম্ভব না। খালি সাধারণ মানুষকেই হয়রানি করা হবে। তার ওপর ভারতীয়দের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে। মোটের ওপর এটা বলা যায়?

হ্যাঁ। ২০০৩-এ পাতা ফাঁদে এনআরসি-র ছাঁকনিতে ধরা যদি পরেন, তবে ২০১৬-এর নাগরিকত্বের কল আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। আসামের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এটাও শিখলাম যে যদি কোনওক্রমে আপনার নাম একবার নাগরিকপঞ্জিতে উঠেও যায়, তাহলেও শান্তি নেই। দেশপ্রেমিকরা সন্দেহ করে নালিশ করলে আবার সে নাম বাদও পড়তে পারে। দেশপ্রেমিকদের সন্দেহের ভিত্তিতে আপনার পিছনে নালিশের ফেউ এবং ঝুটা অবজেকশন দু’টোই লাগতে পারে। তারপর “র”-এর গোয়েন্দা বাহিনী এবং “ইন্টেলিজেন্স বুরো” আপনার ঠিকুজি কুষ্ঠি ঘাঁটতে বসবে। সবশেষে পড়ে থাকবে একটাই প্রশ্ন। বাঙাল বেলতলায় যায় কয়বার?

…………

সেক্ষেত্রে এনআরসি, ক্যাব, এনপিআর নিয়ে আমাদের কী করা উচিৎ?

এক কথায় বলতে গেলে, এনআরসি হল দেশভাগের পরে একবার উদ্বাস্তু হওয়া মানুষদের নতুন করে রিফিউজি বানানোর কৌশল। ক্যাব হল হিন্দু উদ্বাস্তুদের বোকা বানিয়ে দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করার কৌশল। আর এনপিআর হল দেশজুড়ে এনআরসি-র সলতে পাকানোর কৌশল।

এই তিন কৌশলের মধ্যে দিয়ে বাঙালি উদ্বাস্তু, সংখ্যালঘু, দলিত এবং আদিবাসীদের নাগরিকত্ব নিয়ে বিশাল সংকট তৈরি হবে। তাই এনপিআর, এনআরসি, ক্যাব – এই গোটা প্রক্রিয়াটারই বিরোধিতা করা উচিৎ। আমাদের একজোট হয়ে আন্দোলন গড়ে তুলে কেন্দ্রীয় সরকারের এই জনবিরোধী প্রক্রিয়া বাতিল করতে বাধ্য করতে হবে।

………

এনআরসি, ক্যাব, এনপিআর-এর বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তার দাবিগুলি কী?

পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এনআরসি, ক্যাব ও এনপিআর-এর বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই মানুষ প্রতিবাদ করছেন, সংগঠিত হচ্ছেন। বিভিন্ন গণসংগঠন, মঞ্চ, সমিতি, নাগরিক উদ্যোগ ও রাজনৈতিক দল আন্দোলনে শামিল হয়েছে। এনআরসি-বিরোধী আন্দোলনের সাথীরা যে দাবিগুলি তুলেছেন, তা হল-

আসামের এনআরসি ছুট ১৯ লাখ মানুষের জাতি-ধর্ম-ভাষা-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতের নাগরিকত্ব সুনিশ্চিত করতে হবে হবে।

ডিটেনশন ক্যাম্পগুলো বন্ধ করে বন্দিদের অবিলম্বে রেহাই দিতে হবে।

দেশ জুড়ে এনপিআর এবং এনআরসি চালু করার প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

৩১শে জুলাই ২০১৯-এর এনপিআর চালু করার গেজেট নোটিশ সহ এনআরসি সংক্রান্ত সমস্ত কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা প্রত্যাহার করতে হবে।

উদ্বাস্তু-বিরোধী নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০০৩ বাতিল করতে হবে।

মোদী সরকারের আনা সাম্প্রদায়িক, সংবিধান-বিরোধী নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (ক্যাব) প্রত্যাহার করতে হবে।

ভারতে বসবাসকারী সকলের নাগরিকত্ব সুনিশ্চিত করতে হবে।

সুগত চাকী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *