আমার কেদার-বদরী ভ্রমণ

আমার কেদার-বদরী ভ্রমণ

Joy Dev Das

বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি,কত নদনদী, গিরি,রাজধানী =সত্যি এ জগতের সামান্য কিছু দেখে ই আমরা কোনভাবে আছি কিন্তু মানুষ গতিশীল, তাই সে নিজেকে সংকীর্ণ গন্ডীর মধ্যে আবদ্ধ না রেখে চিরপথিক ও ভ্রমণশীল রূপে নিজেকে পরিচিত করে তুলতে চায়।তাই তার এত ভ্রমণস্পৃহা,সে দুরন্ত এবং দুর্দান্ত।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-“জন্তু রা পেয়েছে বাসা, মানুষ পেয়েছে পথ”। তাই তো মানুষ গেয়ে উঠেছে, “আমার এই পথচলা তেই আনন্দ। ” তাই মানুষের ভ্রমণ ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ। সব জাতির মানুষ, বিশেষতঃ,বাঙালী রা চিরকাল ই ভ্রমণপিপাসু । সেই প্রবৃত্তি আমাদের মধ্যে ও এসেগেছিল।আমার মার মৃত্যু হয়ে ছিল বেড়াতে গিয়েই, আসামে কামাখ্যাতীর্থ দর্শন করতে গিয়ে। তারপর দুবছর আর বেড়াতে যাইনি।

কিন্তু আমার এক সিনিয়র সহকর্মী জোর করে ই আমাদের মধ্যে বারুদ টা জাগিয়ে দিলেন,কেদারনাথ, বদরীনাথ ও গোমুখ ঘুরে আসার কথা বলে।আহা! কি সুন্দর জায়গার নামগুলো। কয়েক দিন সময় নিল সিদ্ধান্ত নিতে আর তারপর ই বউবাজারে ডলফিন ট্র্যাভেলস্ এর অফিসে গিয়ে বুকিং।

এটা প্যাকেজ ট্যুর।পূজো সামনে। ষষ্ঠী র দিন যাএা।আমরা মোট পাঁচ জন।আমি, আমার স্বামী, আর কৃষ্ণাদি,কনকদা আর ওদের একমাত্র কন্যাসন্তান বাবুলি।
আমাদের দলে ছিলেন মোট ২৭ জন।ও,বলাই হয়নি সময় টার কথা। সেটা ছিল ১৯৮৯ সালের দুর্গাপূজার ষষ্ঠীর রাত।হাওড়া ব্রীজে ছিল প্রচন্ড জ্যাম।খুব টেনশনে ঠিক সময়ে দিল্লী গামী ট্রেনে উঠে বসলাম। আমাদের গন্তব্য হরিদ্বার।
সারা রাত ঘুম এলোনা। খুব মার কথা মনে পড়ছিল। পরের দিন টা ও কাটিয়ে পরের স ভোরবেলায় এসে পৌঁছালাম সাহারানপুর ও সেখান থেকে বাসে দু’ঘন্টা পর হরিদ্বার।
আমাদের প্রোগ্রাম ছিল এইরকম -হরিদ্বার থেকে গঙগোএী,সেখান থেকে আসা-যাওয়া দুটোই হেঁটে গোমুখ,তার পর বাসে গৌরী কুন্ড হয়ে আবার হেঁটে কেদারনাথ। তারপর বদরীনাথ ও আবার ধীরে ধীরে কলকাতার দিকে ফিরে আসা।
হরি দ্বারের সনধ্যাবেলাটা যে কি মনোরম। মন্দিরের সনধ্যারতি দর্শন করতে করতে আপনাথেকেই চোখ জলে ভিজে যাচ্ছিল।তারপর গঙ্গায় প্রদীপ ভাসিয়ে কি এক অপার শান্তি তে হোটেলে ফিরে এলাম!

পরের দিন সকালে বাসে করে গেলাম গংগোএী।একদম পাহাড়ের মধ্যে চলে এসেছি আমরা। লম্বা একটা বিরাট হলঘরে আমাদের সকলের থাকার ব্যবস্থা।একটা রাত কোনমতে কাটিয়ে পরের দিন সকালে ই তো গোমুখের পথে হাঁটবো।
পরে র দিন ভোরবেলা য় সবাই তৈরি হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম গোমুখের উদ্দেশ্যে।সবার হাতে বাধ্যতামূলক একটা লাঠি যেগুলো হরিদ্বার থেকে ই কেনা হয়েছিল। অপূর্ব প্রকৃতির শোভা চারপাশে। মাঝে মাঝেই রাস্তা এত সরু যে একদিক দেওয়াল ধরে পেছনে না তাকিয়ে যেতে হচ্ছিল। আমার তখন শরীর যেমন সুস্থ, তেমনই মনের জোর ও সাংঘাতিক।
চলেছি তো চলেছি। দলের সবাই গাইছে, “কতদূর আর কতদূর, বলো মা।” কি শান্ত পুরো জায়গাটা।আমার মনে হল,এখানে ই কি স্বর্গ?এই তো সত্যি কারের সাধনার জায়গা, মাঝে মাঝেই একটা চায়ের দোকানে বসে চা খেয়ে পথশ্রমের ক্লান্তি দূর করছিলাম।দু দন্ড জিরিয়ে আবার হাঁটা।দুপুরে একটা চটিতে একটু খিচুড়ি খেয়ে নিতে হল।সারাদিন চলতে হবে। দুজন ম্যানজার ছিলেন মুকুল দা আর নারানদা।সদাহাস্যময় এই দুই দাদা সবার সুবিধা অসুবিধার খোঁজ নিচ্ছিলেন আর মজার কথা বলে মাতিয়ে রাখছিলেন।
হিমালয় তুমি এত্ত সুন্দর! তোমার রূপের কাছে তো কেউ ঘেঁষতে ই পারবেনা। মনে মনে হিমালয় কে বারবার প্রণাম জানাচ্ছি আর এগিয়ে চলেছি পাথুরে রাস্তা ভেঙে। ঠিক সন্ধে সাতটার সময় পৌঁছালাম গোমুখ থেকে একশো ফুট দূরে।
আর হাঁটা যাবেনা। সামনে শুধু বোল্ডার আর বিশাল বিশাল পাথর। অতএব, ওখানেই রাএিযাপন,এবং তাঁবুর মধ্যে। খিচুড়ি খেয়ে আবার ঢুকে গেলাম তাঁবুতে।

পরের দিন ভোরে স্থানীয় কয়েকজন লোক দের হাত ধরে বোল্ডার ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে এসে দাঁড়ালাম গরুর মুখের সামনে। পাহাড়ের মুখ টা ঠিক গরু হাঁকরলে যেমন হয়, তেমনি। আর,ভেতর থেকে অনর্গল তীব্র স্রোতে বারিধারা বেরিয়ে আসছে কত শত বছর ধরে কে জানে!উফ্,কি সাংঘাতিক তার গর্জন, আর তেমনই তার গতিবেগ।গঙ্গা মার পূজা সমাপন হল গঙ্গা জলেই।হঠাৎ দেখি পাহাড়ের মাথায় দুটি হরিণ দাঁড়িয়ে। ঐ উঁচু তে ওদের দেখে চমকে উঠলাম। সঙ্গী রা বললেন,ওরা কস্তূরী হরিণ। মনে পড়ে গেল,”পাগল হইয়া বনে বনে ফিরি আপন গন্ধে মম,কস্তূরী মৃগ সম……”।

ঈশ্বর কে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এবার ফিরতি পথে রওনা দিলাম। কত কি ভাবছি লাম!ভগীরথ এই গঙ্গা কে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছি লেন মর্ত্যে,আবার শিব তাঁর জটার মধ্যে গঙ্গা কে লুকিয়ে রেখে ছি লেন, আবার মহাভারতে দেখি গঙ্গা দেবী দেবব্রতের জন্ম দিয়ে অন্ত র্হিত হয়ে ছিলেন।”গঙ্গা তেরা পানি অমৃত “গাইতে গাইতে সবাই ফিরে চলেছি।পরম তৃপ্তি র ছবি সবার চোখে মুখে।

সারা সনধ্যা হাঁটতে হাঁটতে রাত দশটার সময় গিয়ে পৌঁছালাম সেই গংগোএীর হলঘরে। দেহ ক্লান্ত,কিন্তু মন সতেজ,প্রফুল্ল। আজ ভাবি, ভাগ্যিস,তখনই গোমুখ দর্শন করে এসেছি, এখন সরকার তো দূষণের কারণে গোমুখ যাএা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।

এবার কেদারনাথ দর্শনের পালা। আমরা রওনা দিলাম পরে র দিন সকালে এবং বিকেলে পৌঁছে গেলাম গৌরীকুনডে।একবার কুন্ড টা ঘুরে এলাম,গায়ে মাথায় জল ছিটিয়ে এলাম।মনে মনে প্রস্তুতি নিলাম পরে র দিনের যাএার জন্য।

সকালে উঠে পোশাক পরে নিচে নামতেই আমাকেআর কৃষ্ণ াদিকে বসিয়ে দেওয়া হল দুটো ঘোড়া র পিঠে। পুরুষ রা হাঁটতে শুরু করলেন আর তিনজন বয়স্ক মানুষকে বসিয়ে দেওয়া হল ডান্ডি তে।

ঘোড়া গুলো মোটেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এর ঘোড়া বা দার্জিলিং এর ঘোড়া দের মত নয়।এরা চলেছে সরু পথ ধরে ই,একপাশে হিমালয় তার অপরূপ গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর অনেক নীচে কুলকুল করে বয়ে চলেছে অলকানন্দা। পাহাড়ি ঘোড়া কোন টানে যে বারবার খাদে র দিকে চলে যায় কে জানে।সঙ্গে সহিসরা ছিল খুব সাবধানী।
পাহাড়ের গা দিয়ে ঝর্ণা নামছে।” ঝর্ণা ঝর্ণা, সুন্দরী ঝর্ণা “-আবার ও কবি কে মনে পড়ল। চলতে চলতে বিকেলে চারটে নাগাদ আমাকে ঘোড়া থেকে নামতে হল।সামনে পঞ্চাশ ফুট দূরে কেদারনাথ মন্দির আমাদের আয় আয় করে ডাকছে।

সকলের চোখ অশ্রু সিক্ত। কত মানুষ সারা জীবন চেষ্টা করে ও যেখানে যেতে পারে না,আমি এত তাড়াতাড়ি কিকরে সেখানে এলাম! ভাগ্য ভালো যে মন্দির খালি ছিল, আমরা তাই ভালো করে ঘি মাখিয়ে বাবা কে প্রনাম করলাম।মহাভারত অনুযায়ী ভীম বন বাস থাকাকালীন সেই মহিষকে জাপটে ধরার জন্য মহাদেব রূপী সেই মহিষের শরীরে র প্রথম ভাগ গিয়ে পড়ে নেপালে যেখানে তিনি পশুপতি রাজরূপে বিরাজ করছেন এবং পশ্চাদ্ ভাগ পড়ে হিমালয়ে যেখানে তিনি কেদারনাথ রূপে বিরাজমান।

এই সময় অতি শক্ত মনের মানুষ ও দুর্বল হয়ে পড়ে, অতি বড় নাস্তিক ও ঈশ্বর ভক্ত হয়ে পড়ে। আমরা পূজো সেরে চলে এলাম ভারত সেবাশ্রম সংঘের ঘরগুলোতে। দুটো সোয়েটার আর টুপি পড়ে আমরা কেদারনাথ কে আবার দর্শন করলাম রাজবেশে।দিনে বাবার দীনবেশ আর রাতে রাজবেশ।

এখানেও রাতে খিচুড়ি খেয়ে রাতে শুলাম স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে। অসম্ভব ঠান্ডা ওখানে।কিন্তু কেদারনাথ কে ঘি মাখিয়ে, শঙ্করাচার্যের মন্দির পাশে ই ছিল, তাঁকে প্রনাম জানিয়ে যে স্থান মাহাত্ম্য উপলব্ধি ক রলাম,তাতে জিরো ডিগ্রির ঠান্ডা ও আমাদের কাবু করতে পারলোনা।

সকালে নীচে নেমে দেখিঝলমল করছে সোনালী রোদ্দুর মন্দিরের গায়ে,পাহাড়ের ওপর, সর্বএ।মন্দিরের পেছনে পাশুপত অস্ত্রটি দেখলাম, যেটি বাবা মহাদেব অর্জুনকে দান করে ছিলেন। তারপর হাঁটতে হাঁটতে নামতে শুরু করলাম গৌরী কুন্ডের দিকে।
নামার সময় কোন কষ্ট ই হলনা।কেদারের পথ চড়াই-উৎরাই এর পথ।তাই যাবার সময় ঘোড়া আর ফেরার সময় পাদু’টো ই যথেষ্ট।

বিকেল চারটের মধ্যে গৌরী কুন্ডে ফিরে এলাম। পূর্ণ বিশ্রাম। তারপর নিজেদের মধ্যে গান গল্প হল।তাড়াতাড়ি শুতেই হল কারণ সকালেই তো আবার যাএা। সকালে বাসে করে আমরা আগে গেলাম রুদ্র প্রয়াগ। সেখানে শুধু প্রকৃতির রূপ রস শব্দ গন্ধ কে প্রান ভরে উপভোগ করে এবার সারা রাত বাসে করে গিয়ে পৌঁছে গেলাম বদরীনাথ।

Badrinath temple

বদরীনাথ যাবার রাস্তা সবচেয়ে বিপজ্জনক। সরু পাহাড়ি রাস্তা য় যেকোনো সময় বাস উলটে পড়তে পারে। ঈশ্বরের আশীর্বাদ নিয়ে আমরা ভোরবেলা বদরীনাথ পৌঁছে গেলাম।নারায়ণ সদাজাগ্রত সেখানে কিন্তু হায়!নারী দের
মন্দিরে পূজা দেওয়া বা প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাই,আমরা নীচে দাঁড়িয়ে রইলাম আর পুরুষ রা পূজোপকরণ নিয়ে কাজ করে এলেন। তারা ফিরতেই আমরা আবার হরিদ্বারের দিকে রওনা দিলাম।
হরিদ্বারে অনেক কেনাকাটা হল।মন সকলেরই খুব খারাপ। আবার সেই পুরোন জীবনে ফিরে যেতে হবে।
অগত্যা। আবার রেলগাড়ী চড়ে হাওড়ায় নেমে বাড়ি ফেরা।এতদিন একসাথে থেকে আমরা কয়জন একটা পরিবার হয়ে উঠে ছিলাম, আজও তাদের কারও কারও সাথে যোগাযোগ আছে, আর মনের অন্দরে যত্ন করে রাখা আছে গোমুখ -কেদার-বদরীর স্মৃতি। সারা জীবন আমার সংগে সে থাকবে।ভারত বর্ষ এত বড় আধ্যাত্মিকতার দেশ, মর্মে মর্মে আমি তা অনুভব করে ছি,তাই এই দেশকে আমি বড্ড ভালোবাসি।

সমাপ্ত
*******
রীতা বসু।
ফোন নং-৮২৪০৯০৯৪১০
হোয়াটস্ আপ নং -৭০৪৪৭৬৮৭০৪.
ঠিকানা -ও. ডি আর সি সরকারি আবাসন, ফ্ল্যাট নং- আর/ফোর
কলকাতা -৩৮.

রীতা বসু

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল সরকারী বালিকা বিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *