মথুরায় কংসের কারাগার ও বৃন্দাবনের নিধুবন

মথুরায় কংসের কারাগার ও বৃন্দাবনের নিধুবন

ত্বমেব মাতা চ পিতা ত্বমেব
ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব ।।

পুন্যসলিলা যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত মথুরা বৃন্দাবন আপামর ভারতবাসীর কাছে এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। বঙ্গ সংস্কৃতিতে ও এই পুন্য ভূমির প্রতি শ্রদ্ধা অপরিসীম। সকল বাঙ্গালী ই এই পুন্য ভূমি দর্শন করে অন্তত একবার ব্রজের ধুলি স্পর্শ করে নিজেদের জীবনকে সার্থক করে তুলতে চান। ব্রজভূমির চতুষ্কোণে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য দেবালয় যা বোধ করি একটি ছোট্ট জীবনে দেখে ওঠা সম্ভব নয়।তাই আমি আজ আমার মনের স্মৃতিকোঠায় সঞ্চিত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান মথুরার কংসের কারাগার এবং শ্রী বৃন্দাবন ধামের নিধুবন সম্পর্কে সামান্য কিছু কথা আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করছি।

একথা সর্বজনবিদিত যে মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারে দেবকীনন্দন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জন্ম গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই পিতা বসুদেব দুর্বিনীত কংস রাজার হাত থেকে শিশু গোপালকে রক্ষা করারহেতু প্রবল ঝড় বৃষ্টি এবং উত্তাল স্ফীত যমুনা নদীর জলকে উপেক্ষা করে নদী পার হয়ে গোকুলে নন্দ রাজার কাছে রেখে এসেছিলেন।

তবে যে সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেই সময় থেকে আজকের এই পুন্য ভূমির অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমিও অনেক পূর্বেই মথুরা বৃন্দাবন দর্শন করেছি।সে সময় যাতায়াতের এত সুযোগ সুবিধা ছিল না। মথুরা বৃন্দাবনে ঘোড়ার গাড়ি অথবা টাঙ্গার প্রচলনই ছিল বেশি। মথুরা শহরটি ও ছিল অনেক ছোট। অতঃপর মথুরা স্টেশন থেকে ই একটি টাঙ্গা ধরে কৃষ্ণের জন্ম স্থান অর্থাৎ কংসের কারাগার দেখতে যাত্রা করলাম। মাঝখানে পিচঢালা পথের দুধারে উন্মুক্ত প্রান্তরের সৌন্দর্য এবং টগবগ টগবগ ঘোড়ার পায়ের ধ্বনি বেশ ভালো লাগছিলো। আমার মনেও ছিল বহুশ্রুত বহু চর্চিত কংসের কারাগার অথবা কুঞ্জবিহারীর আবির্ভাব স্থানটি দেখার আনন্দধারা।

ধীরে ধীরে স্থানটির নিকটবর্তী হয়ে টাঙ্গা থেকে নেমে কংসের কারাগারে প্রবেশ করে আমার দুই নয়ন অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছিল। কারাগারটিতে একটি মাত্র ছোট্ট নীচু প্রবেশ দ্বার এবং চারিদিক, মাথার ছাদ থেকে নীচ পর্যন্ত উঁচু পাথরের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, ভিতরে খুব স্বল্প জায়গা নিয়ে তৈরী পাথরের কারাগার। এখন বিজলী বাতির আলো জ্বললেও তখন কারাগারের অন্দরে আলো বাতাস প্রবেশ করার কোন ব্যবস্থাই ছিল না। কারাগারের অনেক ওপরের দিকে একটি একটি জানালা যা আছে তাই দিয়েই তখন যাহোক একটু আলো প্রবেশ করত হয়তো। এক অবর্ণনীয় যাতনা এবং অসহ্য কষ্টের মাঝে দেবকী বসুদেব ছিলেন। ভাবলে বিস্মিত হতে হয় যে,ঐ অন্ধকারাচ্ছন্ন বিপুল ঝড়বৃষ্টির আঁধার রাতে শিশু গোপালকে নিয়ে তিনি কিভাবে যমুনা নদীর ঐ উত্তাল জলরাশি পার হয়েছিলেন? সন্তান স্নেহ একেই বলে।

কারাগারের মাঝখানে একটি উচ্চ বেদীর উপর নাড়ু গোপাল দোলনায় দুলছেন এবং তার চারিদিকে রয়েছে সুসজ্জিত নানা দেবদেবীর পট বা ছবি। কারাগারের ভিতরে নাড়ু গোপালের দোলনার পাশে সেখানকার সেবাইতরাই অবস্থান করে থাকেন অগনিত ভক্তবৃন্দদের ভীড় সামাল দিতে।

অনেকক্ষন ধরে কারাগারটি অবলোকন করে বাইরের চাতালে এসে দাঁড়ালাম সেখান থেকে নীল যমুনা নদীকে দেখবো বলে। দেখতে পেলাম না। সেই সময় হয়তো যমুনা নদী কারাগার সংলগ্নই ছিল , এখন অনেক দূরে সরে গিয়েছে হয়তো। বহু দূর পর্যন্ত নদীর চর দেখতে পেলেও যমুনার জলের ধারা দেখতে পেলাম না।

কংসের কারাগারের কিছুটা পাশেই রয়েছে আরো একটি নবনির্মিত দৃষ্টিনন্দন সুরম্য কৃষ্ণ মন্দির যেটিকেও কৃষ্ণ জন্মভুমি বলেই অভিহিত করা হয়। ভক্তবৃন্দ যারাই কংস রাজার কারাগার দেখতে যান তারা ভগবানের এই আলয়টিকেও সম্পূর্ণ শ্রদ্ধার সঙ্গেই পরিদর্শন করেন। এই মন্দির অভ্যন্তরে অনেক বড় শ্রীকৃষ্ণ রাধিকার মূর্তি স্থাপন করা আছে যা প্রভূত শৃঙ্গারে সজ্জিত। জন্মাষ্টমীর তিথিতে মথুরায় এই কৃষ্ণ জন্মভুমিতে ভারতবর্ষের নানা প্রান্ত থেকে এত সাধুসন্তরা আসেন যে সেখানে তিল ধারণের ঠাঁই পর্যন্ত থাকে না।এই মন্দিরে অভ্যন্তরে শিব, হনুমানজী,শেরাওয়ালী ইত্যাদি বিভিন্ন দেবদেবীর ও মূর্তি রয়েছে। মন্দির গাত্রে কিংবা ওপর প্রান্তে রাধাকৃষ্ণের রাসলীলার নানা মনোগ্রাহী তৈলচিত্র অঙ্কন করা আছে।

যাই হোক, দেবকীর নয়নমণি ও যশোদার যাদু বাছাধনের জন্মস্থান দর্শন শেষ করে এবার আমরা চলেছিলাম বৃন্দাবনের পথে। পথের দুধার ছিল সবুজ গাছ গাছালিতে ভরা। আমার হিয়ার মাঝে এখনও বিরাজ করে সেই মহিমাময় সৌন্দর্যের ডালি এবং টাঙ্গা চলার সেই ছন্দ ময় টগবগ টগবগ অশ্বের পদশব্দের প্রতিধ্বনি।

এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে কথিত আছে মথুরা বৃন্দাবন অনেক আগে ছিল ঠগী ডাকাতদের জায়গা। দর্শনার্থীরা বৃন্দাবনে প্রবেশ করার আগেই ঠগীরা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে তীর্থ যাত্রীদের টাকা পয়সা লুঠ করে নিত। তাই এর হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে বৃন্দাবনের সীমানায় প্রবেশের আগেই একটি হনুমানজীর মন্দির তৈরি করা হয়েছিল যা এখনও বিদ্যমান রয়েছে। বৃন্দাবনে প্রবেশের পূর্বে সকল ভক্তবৃন্দ এই হনুমানজীর মন্দিরে পূজো দিয়ে তারপর বৃন্দাবনে র মাটি তে পা রাখতেন। সকল পুন্যার্থীদের মনে এই বিশ্বাস ছিল যে এই মন্দিরে পূজো দিয়ে গেলে ঠগীদের আক্রমন থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। পূর্ব প্রচলিত ধারা অনুযায়ী এখনও সকলে বৃন্দাবনের প্রবেশ করার আগেই এই হনুমানজীর মন্দিরে পূজা দিতে ভোলেন না।

বৃন্দাবন ধামে প্রবেশ করার পূর্বে আমরাও তাই এই গন্ধ মাদন ধারী হনুমানজীর মন্দিরে পূজো দিয়ে তারপর বৃন্দাবনের মৃত্তিকাতে পা রেখেছিলাম।

যাই হোক, আমাদের টাঙ্গা এবার গিয়ে থেমেছিল নিধুবনের দ্বারপ্রান্তে। নিধুবন, সেও এক অপার বিস্ময়।নিধুবনের চারিদিক উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। এখানকার অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো নিধুবনের বৃহৎ পরিসরটি জুড়ে রয়েছে শুধুই তুলসী গাছ। যুগ যুগান্তর ধরে তুলসী গাছের মস্তক গুলি নীচের দিকে নোয়ানো। এদের উচ্চতাও একদমই বেশি নয়। বলা হয়,এই তুলসী গাছ গুলি সকল সময় শ্রী কৃষ্ণের চরনে প্রনাম জানায় তাই এদের মস্তক এইরকমই সদা অবনমিত।নিধুবনের অন্দর ভাগ খুবই পরিচ্ছন্ন। এখানে ধনী দরিদ্রদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। দরিদ্রগন বিত্তবান সকল শ্রেণীর মানুষ ই এই তুলসী তলায় ঝাড়ু দেন। সকলের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল যে এতে নবঘন শ্যামের কৃপা লাভ ঘটে। এই নিধুবনের মধ্যখানে আছে শ্রী কৃষ্ণ রাধিকার দেবালয় । সেখানে দিবসে পূজা অর্চনা হয়ে থাকে। সন্ধ্যা সমাগমে এখানকার মন্দির যেমন বন্ধ হয়ে যায় তেমনি কোন ভক্ত জনও এমনকি কোন জীবজন্তুও এখানে রাতে থাকতে পারে না। সন্ধ্যার পর সেখানে থাকলে নাকি বিপদ অনিবার্য। প্রতিদিনই যখন সকালে দেবগৃহের দ্বার উন্মোচন করা হয় তখন দেখা যায় মন্দিরের অন্দরে পূজার উপকরণ গুলি এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ভক্ত জনের বিশ্বাস যে এখানে শ্রী মধূসুদন এবং শ্রী রাধিকা রাসলীলা করেন। সকলই বিশ্বাস। বিশ্বাসের ওপর ই ভগবান বিরাজ করেন।


কংসের কারাগার এবং বৃন্দাবনের নিধুবন সম্পর্কে অল্প কিছু কথা আপনাদের কাছে ব্যক্ত করলাম। আপনাদের এই রচনাটি ভালো লাগলে আমারও লেখা সার্থক হয়েছে বলে আমি মনে করবো।

সর্বশেষে কুঞ্জবিহারীর চরণে অর্পণ করি পুষ্পার্ঘ্য__________________

হে কৃষ্ণ! করুণাসিন্ধো! দীনবন্ধো! জগৎপতে! গোপেশ! গোপিকাকান্ত! রাধা কান্ত!নমোহস্তুতে!

বন্দনা সাহা

শ্রীমতি বন্দনা সাহা। (লেখিকা/শিশুসাহিত্যিক)। মুকুন্দ পুর, কলকাতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *