বর্তমান অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি

বর্তমান অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি

বর্তমান করোনা সংকটকালে সমাজে অনেক কিছুই আমূল বদলে গিয়েছে । সেই সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে, শিক্ষাদানের পদ্ধতিও ।

আমরা যেমন-লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন,সোশ্যাল ডিস্টানসিং-এই রকম কতগুলি নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি ; তেমনি আবার পরিচিত হলাম-অনলাইন অর্থাৎ ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শিক্ষা-পদ্ধতি সম্বন্ধে । শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে , এরকমও যে একটা ব্যবস্থা হতে পারে, তা খুবিই চমকপ্রদ । করোনা সংকর্মনের কারণে ,দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় গুলিকে বন্ধ রাখা হয়েছে -এবং তা আবশ্যক ।

এক একটি শিশু জাতির ভবিষ্যৎ । ওরাই একদিন বড় হয়ে দেশের সম্পদ হয়ে উঠবে । এই শিশুদের ক্ষেত্রে অনলাইন শিক্ষা-পদ্ধতি কী আদৌ ফলপ্রসূ? মনে হয়না । একটি শিশুর শিক্ষিত হয়ে ওঠার নেপথ্যে স্কুলজীবন অত্যন্ত জরুরী ।

প্রথমে শিশুদের স্বাস্থ্যের কথাই ধরা যাক । যেখানে, ডাক্তারবাবুরা বারবার বলছেন-মোবাইল বা ইন্টারনেট থেকে শিশুদের যথাসম্ভব দূরে রাখার বাঞ্ছনীয় । নেটের এটি চৌম্বকীয় রেডিয়েশন বিকিরণের ফলে, শিশুদের দৃষ্টিশক্তি বা মস্তিষ্কের কোষের এবং শ্রবনশক্তিরও ক্ষতি হতে পারে । সেখানে , এই অনলাইন শিক্ষা-পদ্ধতি কতটা যুক্তি সংগত ?

স্কুল-জীবন হলো-একটি ছাত্র বা ছাত্রীর গড়ে ওঠার মূল ভিত্তি । ভিত শক্তভাবে স্থাপন না করে যেমন-একটি বড় ইমারত দাঁড়াতে পারেনা , তেমনি সনাতন স্কুলজীবন কে বাদ দিয়ে , কোন বড় পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা কখনো সম্ভব নয় ।

বিদ্যালয়ে শিশু ছাত্র-ছাত্রীরা প্রথম তাদের সহপাঠী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথে পরিচিত হয় । তাদের মধ্যে একটা ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে , তা যান-লাইন বা যন্ত্রের মাধ্যমে কিভাবে সম্ভব ?

সকল ছাত্র-ছাত্রীদের মেধা সমান হয় না । যারা পারতপক্ষে একটু দুর্বল বা ভীত, তাদের প্রতি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের একটু বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন , সে ক্ষেত্রে অনলাইন ব্যবস্থাপনার সার্থকতা যে কতটা? সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে ।

স্বাধীনতার এতগুলি বছর পর হয়ে যাওয়ার পরেও আমাদের দেশের জনসংখ্যার অধিকাংশই গ্রামে-গঞ্জে বাস করে এবং যেখানে বিজলী বাতির কোন ব্যবস্থায় নেই, সেখানে অন-লাইন ব্যবস্থার চাইতে গ্রামের অবৈতনিক স্কুলটিই অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য নয় কি ?আমরা যতই সভ্যতার বিকাশের ধ্বজা তুলে বড়াই করি, এখনও ভারতবর্ষের জনসংখ্যার বেশিরভাগ মানুষের কাছে শিক্ষার আলোটুকু পৌঁছায়নি । অনেকের জীবিকা বা রুজি-রোজগার নেই ,তাদের কাছে এই নতুন শিক্ষা-পদ্ধতির কোন অর্থই হয়না ।

একজন গরিব কৃষক যে, উদয়াস্ত কঠোর পরিশ্রম করে মাঠে ফসল ফলায় এবং মানুষের ক্ষুধা-নিবৃত্তি করে, তার কাছে, তার সন্তানের জন্য গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ই অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য । সেখান থেকেই কৃষকের সন্তানটি একদিন ভবিষ্যতে উচ্চ কোন সাম্মানিক পদে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে । আসল হলো ভিত । ভিত যদি মজবুত না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বড় কিছুর আশা করা বৃথা । এই অন-লাইন পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থার সেই ভিত কি মজবুত হওয়া সম্ভব ?

এখনও গ্রামে, গঞ্জে, এমনকি শহরেও স্কুলছুট ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা কম নয় । তাদের ক্ষেত্রে এই অনলাইন প্রক্রিয়া কোনভাবেই কার্যকরী নয় ।

আমাদের ভারতবর্ষের প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি মানুষ যেদিন এই ইন্টারনেট ব্যবস্ঠার পদ্ধতিকে সম্পূর্ণভাবে করায়ত্ত করতে পারবে এবং এই সুবিধা যখন দেশের প্রতিটি কোনায় কোনায় পৌঁছে যাবে-সেদিন হয়ত, এর উপযোগীতা সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হবে ।

তাই, স্কুল, কলেজ, বিশ্ব বিদ্যালয়ের সনাতন শিক্ষাদানের ব্যবস্থা হারিয়ে যাওয়া একেবারেই বাঞ্ছনীয় নয় । জীবনে উন্নততর প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের মেলবন্ধন বিশেষভাবে প্রয়োজন ।

এখন এই সংক্রমনের সময়, সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলিকে বাধ্য হয়ে বন্ধ রাখতে হয়েছে, -আশাকরি এই দুঃসময় খুব তাড়াতাড়ি কেটে যাবে এবং গোটা সমাজ তার মূল স্রোতে ফিরে আসবে আবার ।।

বন্দনা সাহা

শ্রীমতি বন্দনা সাহা। (লেখিকা/শিশুসাহিত্যিক)। মুকুন্দ পুর, কলকাতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *