মহা তীর্থ কালীঘাট

মহা তীর্থ কালীঘাট

আজ দীপাবলী ও মহা শ্যামাপূজার দিনে আমি আপনাদের সামনে আমার এই প্রতিবেদন টি রাখলাম।
আমার নিবেদন টি ভালো লাগলে আমি সত্যিই আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো।

আদ্যাশক্তি মহামায়া ত্রিনয়নী জগজ্জননী—তব কালো রূপ যে এই ভুবনের নয়নের মণি।

আজ শ্যামা পূজা ও দীপাবলী র পুন্য লগ্নে আসুন আপনাদের সঙ্গে সতীর একান্ন পীঠের একপীঠ মহা তীর্থ কালীঘাটের মায়ের মন্দিরের ভোরের মঙ্গল আরতি ও অন্য কিছু কথা স্মরণ করি।

বলা হয় শ্যামা মা অন্ধকার কালের গর্ভ থেকে উত্থিত হয়ে ছিলেন তাই তিনি কৃষ্ণবর্ণা । মহা তীর্থ কালীঘাটের কালীর উত্থান নিয়ে ও নানান ধরনের পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে। আমরা শৈশবে গল্প শুনতাম যে মায়ের মন্দির লাগোয়া কুন্ড পুকুর থেকে ই তিনি নাকি অর্ধ উত্থিতা। এর অন্তরালে নানান পৌরাণিক কাহিনীর যে বিশদ ব্যাখ্যা আছে সেই বিষয়ে সম্পূর্ণ জ্ঞান সম্পন্ন পন্ডিত গন ই এ বিষয়ে সম্যক রূপে বলতে
পারবেন।আমি শুধু মাত্র পুরানো দিনের কিছু ছবি তুলে ধরছি।

অনেক অনেক আগে মায়ের মন্দিরের চিত্র টা ই ছিল অন্য রকম। তখন এখনকার মতো এত আধুনিক টেকনোলজির উন্মেষ ঘটে নি।পাপনাশিনী গঙ্গা য় তখন প্রতি দিন জোয়ার ভাটা খেলা অনেক জল।ছিল খেয়া পারাপারের ও ব্যাবস্থা।মাঝিরা বৈঠা টেনে যাত্রী দের এক পার থেকেঅপর পারে পৌঁছে দিতেন। এখন সেই গঙ্গা দুর্গন্ধযুক্ত নালায় পর্যবসিত।

আমরা একসময় অনেক শৈশবে কালীঘাটে মায়ের মন্দির সংলগ্ন একটি গৃহে বসবাস করতাম। আমার ঠাকুরমা ছিলেন আচার নিষ্ঠা একজন বিধবা বৃদ্ধা। সেই ভোর থেকে সারাটা দিন নানা পূজা অর্চনা তেই তার সময় কেটে যেত।

তার প্রতি দিনের অভ্যাস ছিল অতি প্রত্যুষের চার ঘটিকায় গঙ্গা স্নান করে কমন্ডুলুতে গঙ্গা জল ভরে নিয়ে সনাতনী র মঙ্গল আরতি দেখবার জন্য মন্দির পানে রওনা দেওয়া। আমি ও সেই ছেলে বেলায় অত ভোরে ঠাকুরমার পিছন পিছন গিয়ে গঙ্গার পারে বসে থাকতাম আর তার গঙ্গা স্নান সারা হলে ঠাকুরমার হাত ধরে চলতাম মায়ের মন্দির পানে মঙ্গল আরতি দেখবার জন্য।

দেবালয়ের গর্ভ গৃহে শুরু হতো মহামায়া র মঙ্গল আরতি।অত প্রত্যুষে ভক্ত সমাবেশ থাকতো খুব কম। গর্ভ গৃহের সামনে একটি উচ্চ স্থানে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে সদানন্দ ময়ীর আরতি দেখতাম। কালীঘাটের হালদার বাড়ির সেবাইতরাই তখন মায়ের মঙ্গল আরতি করে থাকতেন (এখনও হয় হয়তো)। ডান হাতের তালুতে একটি মাটির সরার মাঝখানে অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত করে তা দিয়ে আরতি করা হতো। আরতি সমাপ্ত করে তিনি ভক্তবৃন্দের হাতে কোনোদিন রসগোল্লা কোনো দিন সন্দেশের কনিকা কনিকা মাত্র প্রসাদ বিতরণ করতেন। সেই প্রসাদ ই তখন অমৃত বলে মনে হত।
ভদ্রকালী কার আরতি সেরে তিনি চলে আসতেন মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের মূল ফটকের বামদিকে মধুসূদনের মন্দিরে। সেখানে ও তিনি তদরূপ আরতি করে তার নিজস্ব গৃহে র দিকে চলে যেতেন।

ভোরের আকাশে আলো ফোটার সাথে সাথে দেবীর আলয়ের মূল ফটকের ওপরে অবস্থিত স্থানে নহবতের সানাই বেজে উঠতো।
আমি ও ঠাকুরমা দু’জনে মন্দির টি ঘুরে ঘুরে ষষ্ঠী তলায় পূজো দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে শিবমন্দির ও শীতলা মন্দিরে পূজো দিতাম।

এছাড়া যখন ই মনে হত তখনই দৌড়ে দৌড়ে চলে গিয়ে নাটমন্দির থেকে মায়ের দর্শন করে আবার বাড়ি ফিরে আসতাম। অনেক সময় মধ্যাহ্নে সর্ব মঙ্গলার ভোগের সময় দেখতাম পুরোহিতেরা এক বিশাল থালায় মায়ের ভোগ সাজিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন নারায়নীর সেবার জন্য।

শৈশবের সেই দেখা দৃশ্যগুলো ছিল শুধুই দেখা—কিন্তু আজ এই দৃশ্য গুলি আমার কাছে যে কত অমূল্য তা কারোকে বোঝাবার সাধ্য বুঝি আমার নেই।

অনেক অনেক দর্শনার্থীদের সামনে কাঁসর ঘন্টা বাজিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে সন্ধ্যারতি করা হতো। কাঁসর ঘন্টা র সেই ধ্বনি যেন কল্লোলিনী গঙ্গা র উদাত্ত স্রোতের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যেত।

শারদোৎসবের সময় ও বিশ্ব জননীর পীঠস্থানে চলতো মহাধূমধাম। শুভ বিজয়া তিথিতে এয়ো স্ত্রীরা মাততেন সমবেত সিঁদুর খেলায়।

বসন্ত কালে রামনবমীর দিন মন্দির প্রাঙ্গন থেকে নানা রকম বাদ্য যন্ত্র সহকারে বিশাল বর্ণময় শোভা যাত্রা বের হতো। তাতে অংশ গ্রহণ কারীদের মধ্য থেকে কেউ কেউ রাম লক্ষ্মন সীতা সেজে রথে বসতেন আর লাল রঙের আবির খেলা র মধ্য দিয়ে সেই রথ শহরের বিভিন্ন পথ অতিক্রম করে আবার মন্দির প্রাঙ্গণে এসে থামতো। মেয়েরা নানান রঙ বাহারি শাড়ি আর পুরুষেরা শ্বেত শুভ্র ধুতি পাঞ্জাবি পরতেন।

শিব রাত্রির দিন ভদ্র কালীর মন্দির অভ্যন্তরে ভক্ত গন শিবের মস্তকে প্রহরে প্রহরে জল ঢালতেন। শিবরাত্রিতে ছিল রাত জাগার পালা।
চড়ক ও গাজনের দিনে নাট মন্দিরের সামনে থেকে বের হতোনানা রকম সঙ্ এর শোভা যাত্রা। বহুরূপীর দল শিব দূর্গা কালী কার্তিক গনেশ কৃষ্ণ বলরাম তারা মা ডাকিনী যোগিনী ও আরো কত রকম সাজে সজ্জিত হতেন । পুরুষ রাই সাধারণত এই বহুরূপীর সাজে সাজতেন। তা যে দেখতে কি অপরূপ সুন্দর লাগতো তা ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য আমার নেই।

এবার মহাযোগী মহেশ্বরম নকুল ঈশ্বরের তলার কথা না উল্লেখ করলে বোধহয় এই লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মায়ের মন্দিরে এলে এই পুন্য স্থানে একবার আসতেই হবে তাঁর মস্তকে জল ঢালার জন্য।

কালের নিয়মে যত ই দিন অগ্রসর হবে তত ই সবকিছু বদলে যাবে।এই বদলের সূচনা হয়েছিল সেই দিন যেদিন বিরাট বজ্রপাতের প্রভাবে মায়ের মন্দিরের উপরিভাগের কিছু টা ক্ষতি সাধিত হয়েছিল।সেও অনেক বছর পার হয়ে গেছে।

তখনো বাংলার বুকে সাইক্লোন বৃষ্টি খুব হতো। সেই অভিশপ্ত দিনটিতে ছিল প্রখর রুদ্র বৃষ্টি। ঠিক দুপুর সময়, তখন বোধহয় বেলা বারোটা এক টা হবে তখন হঠাৎ তীব্র আওয়াজ আর তীব্র আলোর ঝলকানি সমেত গুরুগম্ভীর ভাবে বাজটি পড়ল। সবাকার মনে প্রশ্ন এলো বাজটি কোথায় পড়লো? কিন্তু অত তুমুল বারিধারার মধ্যে বোঝা যাচ্ছিল না প্রকৃত বিষয় টি কি? সেই সময় তো এখন কার মতো এত নিউজ চ্যানেল ছিল না। পরদিন প্রভাতে চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল মায়ের মন্দিরের চূড়ায় বাজ পড়েছে।এ খবরে সবাই দিকবিদিগ্ জ্ঞান শূন্য হয়ে মায়ের মন্দির পানে ছুটে ছিলেন। মন্দির গর্ভের কোন ক্ষতি সাধিত হয়েছিল না কেবলমাত্র মন্দির চূড়াগুলির ই কিছু ক্ষতি হয়েছিল। তারপর সেগুলি কে সংস্কার করে দেওয়া হয়। সেই থেকে নানা সংস্কারের ধারা আজো চলছে।

এই মহা তীর্থ কালীঘাটে প্রতিদিন আসেন অগনিতভক্ত বৃন্দ মায়ের আশীষ পেতে। দক্ষ দুহিতা দেবী কালিকা তাঁর সন্তানদের রক্ষা করুন তাঁর হৃদয় মাঝে সঞ্চিত করুনা ধারা দিয়ে।
আমাদের ও এই প্রার্থনা যে মা এই দুঃসহ করোনা মহামারী থেকে পৃথিবীতেশান্তি প্রদান করো।
পরিশেষে মাকে জানাই প্রনাম-

সৃষ্টি স্থিতি বিনাশানং শক্তিভূতে! সনাতনি!
গুনা শ্রয়ে!গুনময়ে! নারায়ণি!নমোহ স্তুতে।।

বন্দনা সাহা

শ্রীমতি বন্দনা সাহা। (লেখিকা/শিশুসাহিত্যিক)। মুকুন্দ পুর, কলকাতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *