কি এই কৃষি বিল, ২০২০? কেনো এই কৃষক বিদ্রোহ?

প্রথম বিলটি: The Essential Commodies ( Amendment) Bill 2020

এই বিল অনুযায়ী চাল, ডাল, আটা, আলু, চিনি, পিয়াঁজ, ভোজ্য তেল সহ মোট ২০ টির বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্য তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং মজুত করার উর্ধ্বসীমা ও তুলে দেওয়া হয়েছে। ১৯৫৫ সালে এই আইনের উদ্দেশ্যই ছিল অভাবের সময় সরকার সরাসরি কৃষকদের থেকে খাদ্যশস্য কিনে গণবণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষদের মধ্যে বিতরণ করবে। এখন থেকে কৃষকদের থেকে এই সমস্ত নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করার জন্য সরকার আর বাধ্য না, সাথে কর্পোরেট ব্যবসায়ীরা এখন থেকে যত ইচ্ছা দ্রব্যাদি অনির্দিষ্টকালের জন্য গুদামজাত করে কৃত্রিম ভাবে বাজারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

দ্বিতীয় বিলটি: The Farmers Agreement of Price Assurance and Farm Services Bill 2020

যার গালভরা নাম দিয়েছে মূল্য নিশ্চয়তা! এই বিল নাকি কৃষকদের আয় নিশ্চিত করবে! কৃষকদের সাথে সরাসরি পেপসিকো, আদানি, রিলায়েন্স এর মত বড় বড় কোম্পানি’রা চুক্তি করতে পারবে। ব্রিটিশ আমলের সেই নীলকর সাহেবদের নীলচাষের প্রথা একটু ঘুরিয়ে ফিরে আসছে আরকি। বড় বড় কোম্পানি গুলোর সাথে কৃষকদের চুক্তি হওয়ার পর কোনো কারণে উৎপন্ন ফসল পছন্দ না হলে তা কিনতে কিম্বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে ফসল নষ্ট হলে সেই আর্থিক ক্ষতির দায় নিতে কোম্পানি গুলো বাধ্য না। সরকার বলছে সেক্ষেত্রে ক্ষতির মূল্য পেতে চাষী-রা আইনের সাহায্য নিতে পারে। কিন্তু আপনার কি মনে হয় আদানি, পেপসিকো-দের সাথে আপনার পাড়ার গরীব চাষী মদন দা দের কোর্টের আইনি লড়াই লড়ার মত পকেটের জোর আছে?

তৃতীয় বিলটি: The Farmers Produce Trade and Commerce Bill 2020

এর ফলে ক্রেতা ব্যাবসায়িক সংস্থাগুলির সাথে কৃষকরা সরাসরি কেনাবেচা করতে পারবে মুক্তভাবে। এক্ষেত্রে সরকার আর কোনো রকম হস্তক্ষেপ করবে না। ‘স্বামীনাথন কমিশনে’র সুপারিশ মেনে খরচের দেড় গুণ দাম কৃষকদের জন্য সুনিশ্চিত করতে হবে সেই দায়ভার থেকে সরকার হাত তুলে নিলো। এমনকি এই বিলে বিদ্যুতের সরবরাহ সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতে কৃষককে ভর্তুকি বন্ধ করার ব্যবস্থার ও উল্লেখ আছে।

যে দেশের জনসংখ্যার শতকরা ৫২ ভাগ পরিবার কৃষির উপর নির্ভরশীল, যে দেশের কৃষি কাজের সাথে যুক্ত ১৪.৬৫ কোটি পরিবারের মধ্যে ৫৪.৬০ শতাংশ পরিবার ভূমিহীন, যে দেশের সরকার নিজেদের ব্যর্থতা ডাকতে ২০১৬ সালের পর থেকে কৃষক আত্মহত্যার রিপোর্ট প্রকাশ বন্ধ করে দেয় আপনাদের মনে হয় সেই দেশের নিপীড়িত শোষিত অন্নদাতা এই কোটি কোটি কৃষক-রা আদেও ওই কর্পোরেট দের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকতে পারবেন?

১২ মিনিট ৩৭ সেকেণ্ড ছাড়া আমাদের দেশে একজন করে কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এই দেশে কোটি কোটি টাকার কর্পোরেট ঋণ মুকুব হলেও কৃষি ঋণ আর মুকুব হয়না। কৃষক দের পরিবারগুলোর একটু ভালো করে বাঁচতে চাওয়ার স্বপ্নগুলো আর সত্যি হয়না। তার বদলে এভাবেই সরকার নতুন নতুন বিল এনে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে তাদের পায়ের তলাতে পিষে মারতে চাইছে।

গণতান্ত্রিক দেশে এই কৃষি বিল কে আপনি সমর্থন করতেই পারেন, সরকারের প্রতি কুণ্ঠাহীন আনুগত্যের জোয়ারে গা ভাসিয়ে আন্দোলনকারী কৃষকদের কঙ্গনা রানাউত এর মত দেশদ্রোহী হিসেবে আপনি দেগে দিতেই পারে, সারাদিন হিন্দু-মুসলিম, মন্দির-মসজিদ, কাশ্মীর-পাকিস্তান করায় ব্যস্ত থেকে কৃষকদের ন্যায্য প্রাপ্য অধিকার নিয়ে কথা বলা কে আপনি ‘ওয়েস্টেজ অফ টাইম’ বলতেই পারেন কিন্তু জেনে রাখুন আপনার ব্রেকফাস্টের ওই আলুর দম আর ফুলকো লুচি থেকে দুপুরের ভাতের ওই চাল কিম্বা রাতের সব্জির সবটুকুই ওই কৃষক দেরই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। ওনারা থাকলে তবেই আপনার রোজের মেনুতে শুক্ত, আলুপোস্ত, পটলের দোর্মা, ফ্রায়েড রাইস এসব থাকবে।

তাই এখন থেকে প্রতিবার যখন এই কৃষি বিলের সমর্থনে কথা বলতে যাবেন শুধু একটাই সংখ্যা মনে রেখে দেবেন, ১২ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড। ওই ১২ মিনিট ৩৭ সেকেণ্ড ছাড়া একজন করে কৃষক মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে আপনিও দায়ী থাকবেন। হ্যাঁ আপনিও।

নিজস্ব প্রতিনিধি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *