এক অম্লান স্মৃতিকথা

এক অম্লান স্মৃতিকথা

গতকাল মুহূর্ত ফেসবুকে সম্মানীয় যাদুকর জুনিয়র পি সি সরকারের পক্ষ থেকে পোস্ট করা বহু পুরোনো একটি ছবিতে তার পিতার অর্থাৎ যাদু সম্রাট সিনিয়র পি সি সরকারের যাদু দেখানোর সরঞ্জাম হিসেবে একটি গাড়ি কে ক্রেন দিয়ে ওপরে তুলতে অথবা নীচে নামিয়ে নিতে দেখা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে তার লেখা টিও পড়লাম। খুব ভালো লাগলো।

photo courtesy of facebook

photo courtesy of facebook

তদানীন্তন সময়ে নিউ এম্পায়ার, লাইট হাউস, গ্লোব, মেট্রো এই হলগুলি ছিল আভিজাত্যের মানদন্ডে একেবারে প্রথম সারিতে।

এই অসাধারণ চিত্র টি দেখে আমার নিজের মনের অতলে চুপ করে ঘুমিয়ে থাকা কিছু কথা স্মৃতিপটে ভেসে উঠলো। স্মৃতি সতত ই সুখের।আজ এই প্রবীণ বয়সে এসে মাননীয় জুনিয়র পি সি সরকার মহোদয়এবং মুহূর্তের সকল সদস্য বৃন্দ ও কতৃপক্ষগনের সঙ্গে এই স্মৃতিসুধা ভাগ করে নিলাম।

সময়টা ১৯৭৩সাল। তখন আমি Women’s Christian College এর বি এ ক্লাসের প্রথম বর্ষের ছাত্রী বন্দনা রায়। সেই বছর আমার পিতা বালিগঞ্জ স্টেশনের ওপারে একটা বাসা বাড়ি ভাড়া নিলেন কয়েকটি বছর সেখানে থাকার জন্য। তারপর আগামী চার পাঁচ বছর ঐ ভাড়া বাড়িটি ই ছিল আমাদের বসবাসের ঠিকানা।

কোলকাতা শহর সর্বদা জনারণ্যে জমজমাট। অফিস স্কুল কলেজের সময়ে ট্রামে বাসে থাকতো বাদুড় ঝোলা ভীড়। তখন তো এখন কার মতো এত এ সি , ইলেকট্রিক বাস,ও ঘরে ঘরে নিজস্ব বাহন বা মেট্রো রেল ছিল না। ট্রামে বাসে যাতায়াত করাই ছিল যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম

আমার সেই অল্প বয়সে আমি ছিলাম ভীষন স্বল্পভাষী এবং ভীতু প্রকৃতির ব্যাক্তি।

আমার জনক ই প্রথম কয়েকদিন আমাকে ২৪ নং ট্রামে করে কলেজে যাওয়ার পথটি চিনিয়ে দিলেন। এবার আমার একাই কলেজে যাওয়ার পালা।সে সময় ট্রামে ও অফিসের নিত্য যাত্রী দের ভীড় থাকতো খুব তা তো আগেই বলেছি।এই ভীড় ও ভীড় ও আমার কাছে ভয়ানক একটি বিষয়।

Tram Deepo

বালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো র গা ঘেঁষেই রয়েছে বিশ্ব বরেণ্য যাদু সম্রাট সিনিয়র পি সি সরকারের বড় লোহার গেট ওয়ালা সুবৃহৎ বাড়িটি। পাশে বড় বড় হরফে লেখা ছিল সি সরকার (বাড়ি টি র রং ছিল সম্ভবত হলুদ আর লোহার গেট টির রং ছিল কালো। অনেক বছরের কথা। আমার ভুল ও হতে পারে)।

ভীড় এড়িয়ে চলার লক্ষ্যে আমি প্রতিদিন তাঁর ঐ প্রাসাদোপম বাড়িটির লোহার গেট টির সামনে দাঁড়াতাম ট্রামে উঠবো বলে। কারণ সেই জায়গাটিতে এসে উক্ত যানের গতি একেবারে শ্লথ হয়ে যেত আর আমি ও স্বচ্ছন্দে তাতে চড়ে একটি কোনে বসে পড়তাম। যেটুকু সময় ট্রামের জন্য অপেক্ষা করতাম ভাবতাম এই বিশাল বাড়ি টি র অন্দরে বাস করেন এক রূপকথার যাদু সম্রাট সিনিয়র পি সি সরকার। গৃহ টি র দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। কিন্তু কোন দিন ও সেই ভুবন জোড়া খ্যাতি সম্পন্ন মানুষ টি কে দেখিনি বা মনের অদম্য ইচ্ছে থাকলেও তার মহাজাগতিক ইন্দ্রজালে র কোন অনুষ্ঠান দেখা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।(অনেক পরবর্তী সময়ে অবশ্য জুনিয়র সরকারের ইন্দ্রজাল একবার মহাজাতি সদন ও একবার উত্তম মঞ্চে দেখেছি।)

তা যাই হোক আমার কলেজ জীবনের ঐ তিনটি বছর প্রতিদিন ঐ নির্দিষ্ট জায়গা টি থেকে ই সেই ২৪ন নং ট্রামে করে ই কালীঘাটের women’s Christian College এ যাতায়াত করেছি।

তারপর ঐ ভাড়া বাড়িটি তেই আমার বিয়ে হয়ে যাবার পর স্বামীর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সেই যে কলকাতার বাইরে দূরে সংসার করতে চলে গেলাম তারপর থেকে আর কখনো ঐ স্বনামধন্য ব্যাক্তি টির বাড়ির সামনের ঐ বড় লোহার গেট টির সামনে আর দাঁড়ানো হয়নি।

এতবছর বাদে জীবনের গতিপথের অনেক পরিবর্তন হয়ে গেলেও আমার স্মৃতিতে ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে সেই স্থান টির স্মৃতি।

এখন আমাদের বাড়ি কলকাতার মুকুন্দপুরে হলেও সেই বালিগঞ্জ স্টেশনের রেললাইন পার হয়ে ওপারে ও যেমন আর যাওয়া হয়না তেমনভাবে আমার ২৪ নং ট্রামে ওঠার সেই জায়গায় টিতেও আর এযাবৎ যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

আমার পিতৃগহ ও এখন অন্যত্র পিতাও প্রয়াত।মা আছেন তিনিও অনেক বয়সের সীমান্তে।

আজ উগ্র আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেখানকার পথঘাটের আমূল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে হয়তো তবুও আমার মানস চক্ষে আজ ও অম্লান হয়ে আছে সেই সিনিয়র ভুবন বন্দিত পি সি সরকারের বড় লোহার গেট টির সামনে র সেই জায়গা টি যেখান থেকে প্রতিনিয়ত তিনটি বছর আমি কলেজে যাওয়ার জন্য ২৪ নং ট্রাম টি ধরতাম আমি।।

এই নিবেদন টির মাধ্যমে আমি সম্মানীয় যাদুকর জুনিয়র পি সি সরকার এবং মুহূর্তের সকল বন্ধুদের জানাই আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ।

বন্দনা সাহা

শ্রীমতি বন্দনা সাহা। (লেখিকা/শিশুসাহিত্যিক)। মুকুন্দ পুর, কলকাতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *