সমাজ জীবনে বিজ্ঞাপনের কুপ্রভাব

সমাজ জীবনে বিজ্ঞাপনের কুপ্রভাব

বর্তমান বিপণনের যুগে যে কোন সামগ্রী বিক্রয়ের মাধ্যম হিসাবে বিজ্ঞাপনকেই বেছে নেওয়া হয়, যাতে সেইসব জিনিসগুলির খবর যথাসম্ভব অধিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।এখন জনজীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে গিয়েছে বিজ্ঞাপন।ঠাণ্ডা পানীয় থেকে সাবান, ঘড়ি, গাড়ি, বাড়ি, বহুমূল্য পোশাক সম্ভার, খেলাধূলা, ছোটদের কার্টুন এমনকি দশভুজার আরাধনাও আজ বিজ্ঞাপনদাতা দ্বারা আয়োজিত।শহরের পথে চলতে চলতে চোখে পড়ে বিজ্ঞাপনের নানা লোভনীয় ব্যানার বা হোর্ডিং।একদিন হয়তো এমন আসবে যে আমাদের মাথার ওপরে সীমাহীন এই নীল আকাশটাও ঢেকে যাবে নানারকম বিজ্ঞাপনের মনোহারি ফেস্টুনে।অসীমের দিকে তাকিয়ে মুক্তির আস্বাদ অনুভব করা যাবে না আর।

এখন বিজ্ঞাপনদাতারাই হলেন সকল শিল্প সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক এবং সর্বেসর্বা।ভাবতে ভয় হয় আমরা হয়তো আগামী দিনে এমনও সময়ের মুখোমুখি হতে পারি যখন মানুষের অন্তরের মায়া মমতা, ভালবাসা ঘৃণা সবই বিজ্ঞাপনদাতা দ্বারাই বিপনন করা হবে ।

বিজ্ঞাপন যে পূর্বেও ছিল না তা নয়।রেডিও র যুগেও আমরা নানা রকম পণ্যের বিজ্ঞাপন শুনতাম।সিনেমা হলে সিনেমা শুরু হওয়ার আগে সিনেমার পর্দায় ভেসে উঠতো কিছু বিজ্ঞাপন।তখনওএর এত আগ্রাসী ছায়া সমাজকে গ্রাস করেনি।রেডিওতে প্রচার হওয়া বিজ্ঞাপনগুলি নিয়ে অনেক কৌতুক করা হতো যা মানুষের মনে হাস্যরসের খোরাক যোগাতো। কেবল কানে শুনে সেগুলির কল্পনা করে নেওয়া ছিল আলাদা একটি বিষয়।

কিন্তু এখন রেডিওর যুগ চলে গিয়ে ঘরে ঘরে জায়গা করে নিয়েছে রঙিন টেলিভিশন সেট, কমপিউটার, স্মার্ট ফোন ইত্যাদি ।

সাদাকালো টেলিভিশনের সময়ও বিজ্ঞাপন ছিল, কিন্তু তখন চ্যানেলের এত আধিক্য ছিল না ।দুই একটি চ্যানেলে অত্যন্ত নগণ্য বিজ্ঞাপনও এতটা যন্ত্রণাদায়ক ছিল না ।
কিন্তু এখন টিভির অগুনতি চ্যানেল আর তাতে প্রচারিত বহুল পরিমাণে বিজ্ঞাপণ ।
ঘরের অভ্যন্তরে টেলিভিশন সেট খুললেই যে কোনও অনুষ্ঠান শুরুর পূর্ব মুহূর্তে পর্দায় ভেসে ওঠে নানা রকম উত্তেজক বিজ্ঞাপন।
কিছু কিছু বিজ্ঞাপন অত্যন্ত অশালীন এবং কুরুচিপূর্ণ যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। বিজ্ঞাপনদাতাদের লক্ষই হলো যে কোনও উপায়ে মুনাফা অর্জন করা।
এই বিজ্ঞাপন গুলি জনমানসে ভীষণ বিপরীত প্রভাব ফেলে থাকে এবং এগুলি মানুষের মস্তিষ্কের কোষের মধ্যে এমন বিপরীত বিক্রিয়া তৈরি করে যা থেকে রাগ, হিংসা প্রতিহিংসা পরায়নতা এমনকি শারীরিক অস্থিরতার জন্ম দেয়।
শিশুদের বিকাশের দর্পণে এর প্রভাব বিভিন্ন সময়ে ভীষণ মারাত্মক হয়ে দেখা দিচ্ছে । তারা এই বাস্তব বোধহীন বিজ্ঞাপনের ভাষা গুলিকেই জীবনের অমোঘ সত্য বলে মেনে নেয়।অভিভাবকদের দৃষ্টির অন্তরালেই শিশুদের মনের মধ্যে এই কল্পনার জগত বাসা বাঁধতে থাকে অশ্বথ্থ বটের শিকড়ের মতো।তারা স্কুলে যায় পড়াশুনা করে ঠিকই কিন্তু মনের এক কোনে স্বপন রঙিন এই কল্পনাগুলি বাস্তব হয়েই থেকে যায় ।
তারপর তারা যখন কৈশোরে পদার্পণ করতে আরম্ভ করে তখন এই অপার্থিব ঝুটো জিনিসগুলি পেতে চেষ্টা করে।বাস্তব জীবন যে কতটা কঠিন আর জীবনের সাফল্যের যে কোনও শর্ট কাট হয় না তা তারা কৈশোরের কোমল মনে মোটেই উপলব্ধি করতে পারে না ।অনেক সময় অভিভাবকদের কাছে তারা এমন এমন আকাশকুসুম বস্তু দাবি করে বসে যে সেই আব্দার পূর্ণ করা বাবামায়ের পক্ষে অসাধ্য হয়ে পড়ে ।যার ফলশ্রুতি হিসাবে কিশোর কিশোরীরা অনেক সময় অত্যন্ত বদমেজাজি হয়ে পড়ে, অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হয়, এমনকি মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয় ।আকাশের বুক থেকে খসে পড়া তারার মতো একটি সম্ভাবনাময় জীবন সমাজের বুক থেকে অকালেই ঝরে যায়।
যখন সংবাদপত্রে এই ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হয় তখন মনটা দুঃখে ভরে যায়।
এক্ষেত্রে এই অঘটন ঘটে যাওয়ার আগে অভিভাবকদের তো বটেই বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকাদেরও দায়িত্ব রয়েছে এই কোমল বয়সে আসা ছাত্র ছাত্রীদের বোঝানো ।তারা বোঝানও কিন্তু মনের অভ্যন্তরে যে লোভ লালসা একবার বাসা বেঁধে ফেলে তাকে উপড়ে ফেলা কি অত সহজ হয়?

রাজনীতিবিদরা একটা সময় সংসদ ভবনে এই অশালীন এবং বাস্তবোধহীন বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে সোচচার হতেন।এখন তাও অন্তর্হিত।

বিজ্ঞাপনের এই সর্বগ্রাসী করাল ছায়া এবং বিভ্রান্তি হয়তো একদিন সমাজকে আরও অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যাবে যার থেকে মুক্তি পাওয়া আর সম্ভব হয়ে উঠবে না ।

এমন বলা হচ্ছে না যে বিজ্ঞাপন দাতারা তাদের দ্রব্যের বিজ্ঞাপন দেবেন না বা মুনাফা অর্জন করবেন না ।কিন্তু তাদেরও যে একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে সেকথা ভুললে চলবে না।
কুরুচিপূর্ণ বিজ্ঞাপনগুলিকে একটু দৃষ্টিনন্দন এবং সুখশ্রাব্য করে দেখানো যায় এবং তার মধ্যে বাস্তবতা এবং মানবিকতার মিশেল ঘটানো যায় তাহলে হয়তো সেই বিজ্ঞাপনগুলি সমাজের পক্ষে অনেক সহায়ক হয়ে উঠবে।

এখনও সময় আছে।যদি এরকমটি করতে পারা যায় তবে সমাজ তো উপকৃত হবেই আর আগামী প্রজন্মও কল্পনার রঙফানুসে না ভেসে তাদের সঠিক পথটি বেছে নিতে পারবে —–দিশেহারা হয়ে পথ হারাবে না কখনও।।

বন্দনা সাহা

শ্রীমতি বন্দনা সাহা। (লেখিকা/শিশুসাহিত্যিক)। মুকুন্দ পুর, কলকাতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *