প্রশ্নোত্তরে নাগরিকত্ব

অধিবাসী ও নাগরিকের মধ্যে পার্থক্য কী?

অধিবাসী অর্থাৎ Resident শব্দের অর্থ হল বসবাসকারী। একটি অঞ্চল বা দেশে যারাই কিছু সময় ধরে বসবাস করেন, তারাই সেই সময়ে সেই অঞ্চল বা দেশের অধিবাসী। আবার নাগরিক অর্থাৎ Citizen হলেন তারাই, যারা সেই দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হন।

মোদ্দা কথা হল, যারা ভোটদানের অধিকারী, তারাই নাগরিক। ধরা যাক, একজন নাইজেরিয়ান পড়াশুনোর জন্য টানা পাঁচ বছর ধরে ভারতে আছেন। তিনি অবশ্যই ভারতের অধিবাসী, কিন্তু নাগরিক নন। কারণ, ভারতে ভোটদানের অধিকার তার নেই। আবার ধরা যাক, একজন ভারতীয় ভোটার চাকরিসূত্রে গত একবছর ধরে সৌদি আরবে আছেন। তিনি এই মুহূর্তে ভারতে নেই ঠিকই, কিন্তু তার ভোটদানের অধিকার চলে যায়নি। তাই তিনি ভারতীয় নাগরিক।

ভারতের নাগরিকত্ব কী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়?

ভারতের যাবতীয় রাজনৈতিক ধারণা ও প্রক্রিয়ার উৎস কিংবা ভিত্তি হল সংবিধান। ভারতীয় সংবিধানের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫ম থেকে ১১তম অনুচ্ছেদে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে। ৫ম ও ৬ঠ অনুচ্ছেদে সংবিধান প্রযুক্ত হবার দিন অর্থাৎ ২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০ তারিখে কারা কারা ভারতীয় নাগরিক, সেটা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আবার ১১তম অনুচ্ছেদে নাগরিকত্ব বিষয়ে আইন প্রণয়নের অধিকার দেওয়া হয়েছে সংসদ-কে। সেই মত ১৯৫৫ সালে সংসদ ‘ভারতের নাগরিকত্ব আইন’ প্রণয়ন করেন। পরবর্তীকালে ১৯৮৬, ১৯৯২, ২০০৩, ২০১৫ এবং অতি সম্প্রতি ২০১৯ সালে সেই আইনের সংশোধন করা হয়েছে। ভারতের নাগরিকত্বের বিষয়টি সাংবিধানিক নির্দেশ ও নাগরিকত্ব আইন দ্বারাই নির্ধারিত হয়। অন্য কোনো কিছু দ্বারা নাগরিকত্ব বিষয়টিকে ইচ্ছেমত পরিচালিত করা যায় না।

ভারতের নাগরিকত্ব কত রকমের?

২০০৩ সালের সংশোধনের পরে ভারতে চার ধরণের নাগরিকত্বের বন্দোবস্ত আছে। এগুলো হলঃ

ক) জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (Citizenship by Birth) যা ২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০ তারিখে বা তার পরে ভারতে যাদের জন্ম, তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
খ) উত্তরাধিকারসূত্রে নাগরিকত্ব (Citizenship by Descent) যা বিদেশে জন্মগ্রহণ করা ভারতীয় নাগরিকের সন্তানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য
গ) নথিভূক্তির মাধ্যমে নাগরিকত্ব (Citizenship by Registration) যা ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নন, এমন কোনো স্থায়ীভাবে বসবাসকারীর ক্ষেত্রে প্রযুক্ত। সেই ব্যক্তিকে অতি-অবশ্যই ভারতীয় বংশোদ্ভূত হতে হবে।
ঘ) বৈদেশিক নাগরিককে নাগরিকত্ব প্রদান (Citizenship by Naturalisation) যা ভারতে বৈধভাবে বসবাসকারী কোনো বিদেশী নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়ম কী?

২০০৩ সালের সংশোধনের পরে জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্বের নিয়ম সময়ভেদে তিন রকম, যথা –

  • ক) ২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০ বা তার পরে কিন্তু ১ জুলাই, ১৯৮৭-র আগে ভারতের মাটিতে যাদের জন্ম, তারা ভারতীয় নাগরিক।
  • খ) ১ জুলাই, ১৯৮৭ বা তার পরে কিন্তু ৮ জানুয়ারি, ২০০৪-এর আগে যাদের জন্ম ভারতে এবং জন্মের সময়ে যার বাবা কিংবা মায়ের মধ্যে কোন একজন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন, তিনি জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক।
  • গ) ৮ জানুয়ারি ২০০৪ তারিখ বা তার পরে যার জন্ম হয়েছে ভারতে এবং জন্মের সময়ে যার বাবা-মায়ের উভয়েই ছিলেন ভারতীয় নাগরিক অথবা একজন ভারতীয় নাগরিক এবং অপরজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নন, তিনি জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক।

জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ভারতের মাটিতে জন্ম হয়েছে, এটা সব ক্ষেত্রেই বলা হয়েছে। কিন্তু জন্ম যে ভারতেই হয়েছে, তার প্রমাণ কী?

সাধারণভাবে বার্থ সার্টিফিকেট-ই হল জন্মের সময় ও জন্মস্থানের সঠিক প্রমাণপত্র। যে আইনের বলে এই সার্টিফিকেট দেওয়া হয়, ভারতে সেই আইনের নাম হল The Registration of Births and Deaths Act, 1969। বোঝাই যাচ্ছে, আইনটি রচনা হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। আর ভারতে সেই আইন প্রথম প্রযুক্ত হয় ১ এপ্রিল, ১৯৭০। অর্থাৎ ২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০ থেকে ৩১ মার্চ, ১৯৭০ ভারতে বার্থ সার্টিফিকেটের কোনো আইনি সংস্থান ছিল না। আবার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ১ এপ্রিল, ২০০২-এর আগে পঞ্চায়েতের হাতে বার্থ সার্টিফিকেট দেবার অধিকারও ছিল না। ফলে ৩১ মার্চ, ২০০২ তারিখের আগে যাদের জন্ম হয়েছিল শহরে পুরসভা এলাকায়, একমাত্র তাদেরই বার্থ সার্টিফিকেট থাকবার কথা। ১ এপ্রিল, ২০০২ তারিখের আগে কোনো পঞ্চায়েত যদি এমন কোনো বার্থ সার্টিফিকেট প্রদান করে থাকে, তার আইনি সংস্থান নেই, সেটি গ্রহণযোগ্য নয়।

তাহলে কী হবে?

এতদিন পর্যন্ত এক্ষেত্রে পরিপূরক নথি হিসাবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড কিংবা সার্টিফিকেট, স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট-কে মান্যতা দেওয়া হয়ে এসেছে। কিন্তু ভারতবর্ষের অধিকাংশ নাগরিক-ই (অন্তত যাদের বয়স ৪০ বা তার উপরে) কোনদিন স্কুলের মুখ দেখেননি। মাধ্যমিক পরীক্ষা দেননি, এমন মানুষের সংখ্যা আরো বেশি। তার মানে এই জায়গায় একটা ধোঁয়াশা আছে, এবং ভারতবর্ষের অধিকাংশ মানুষেরই সেই সমস্যা আছে। আইন স্পষ্ট করে এখানে কিছু বলেনি। এখন আচমকা জোর খাটিয়ে আইনের প্রয়োগ করতে গেলে অধিকাংশ ভারতীয়কে ভুগতে হবে।

কেউ যে ভারতীয় নাগরিক, তাহলে তার প্রমাণ কী?

মুশকিল হল, জন্মসূত্রে যারা ভারতীয় নাগরিক, তাদের সরাসরি কোনো প্রমাণপত্রের বন্দোবস্ত নেই। যারা উত্তরাধিকারসূত্রে কিংবা নথিভূক্তির মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তাদের কিন্তু প্রমাণপত্র আছে। কারণ তাদের নাগরিকত্বের জন্য লিখিতভাবে আবেদন করতে হয় এবং তাদের লিখিত সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। সেই সার্টিফিকেটে কোনদিন থেকে তারা নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি পেলেন, সেটা স্পষ্ট ভাষাতে উল্লেখ করা থাকে। জন্মসূত্রে যারা নাগরিক, তাদের কিন্তু এভাবে আবেদন করার কোনো নিয়ম নেই। স্বভাবতই তারা আবেদনও করেন না। তাই তাদের নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট নেই। তবে সরাসরি না হলেও ঘুরিয়ে নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র তাদেরও আছে। সেটি হল ভোটার কার্ড।

তাহলে যে সম্প্রতি বলা হচ্ছে, ভোটার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়?

কথাটা ভুল এবং মিথ্যে। কেন? ভোটার কার্ডের আসল নাম হল EPIC অর্থাৎ Elector’s Photo-identity card। তাহলে এই কার্ড কাদের দেওয়া হয়? অবশ্যই ভারতীয় ভোটারদের। কারা ভারতীয় ভোটার? ভোটার তালিকায় যার নাম আছে। আপনার ভোটার কার্ডে শুধু আপনার নাম, বাবার নাম, বয়স, ঠিকানা আর ছবি নেই; আপনি যে বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার, সেটিও উল্লেখ করা আছে। আছে আপনার ভোট কেন্দ্রের নাম ও পার্ট নাম্বার। ভোটার লিস্টে নাম না থাকলে এগুলো দেওয়া সম্ভব নয়।

ভারতীয় সংবিধানের ১৫তম অধ্যায়ের ৩২৬ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ১৮ বছরের উর্ধে প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকেরই ভোটদানের অধিকার রয়েছে, অর্থাৎ তারাই হলেন ভোটার। বোঝাই যাচ্ছে, ভোটার হতে গেলে দুটি শর্ত আছে। প্রথমটি বয়েস, আর দ্বিতীয়টি ভারতীয় নাগরিকত্ব।

ভারতীয় নাগরিক না হলে ভোটার লিস্টে নাম ওঠার প্রশ্ন-ই ওঠে না। তাহলে যুক্তির স্বাভাবিক প্রয়োগে এই ব্যাখ্যাই আসে যে ভোটার লিস্টে নাম থাকা মানেই তিনি ভারতীয় নাগরিক। মাথায় রাখতে হবে, আসামে ১৯৫০ সালের NRC-র তালিকা তৈরির সময়ে ১৯৫১ সালের সেনসাস এবং ১৯৫২ সালের ভোটার তালিকাকেই ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছিল। ভোটার তালিকায় নাম থাকাটা সেখানেও নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবেই গৃহীত হয়েছিল। তাহলে আজ হঠাৎ বিধান বদলে যাবে কেন?

কিন্তু মাঝেমধ্যেই যে শোনা যায় ভোটার লিস্টে প্রচুর জল মেশানো আছে; অনেক বহিরাগতের নাম উঠে গেছে। তাহলে?

এমন ভুতুড়ে নাম ভোটার লিস্টে থাকতেই পারে, এবং থাকেও। তার একটা বড় কারণ হল যারা ভোটে লড়েন, সেইসব রাজনৈতিক দলের স্বার্থ। কারা ভুতুড়ে ভোটার, তারাই সবথেকে ভালো জানেন। এবং সেই ভোটটা তারা স্বচ্ছন্দে নিজেদের সিম্বলে করিয়ে নিতে পারেন। প্রতি বছর নির্বাচন কমিশন তাই ভোটার লিস্ট সংশোধনের কাজ করে থাকেন। নতুন করে কিছু মানুষের নাম ওঠে, আবার অনেকের নাম বাদ-ও যায়। এর পরেও মৃত কিংবা বহুদিন ধরে এলাকায় নেই, এমন মানুষের নাম-ও ভোটার লিস্টে থেকে যায়। কিংবা আদৌ নেই, ঢুকে যায় এমন মানুষের নাম-ও।
এমন সম্ভাবনা সব সময়েই থাকে।

কিন্তু সেই পরিমাণটা কত, সেটাই ভেবে দেখার। ২০১১ সালের সেনসাস অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ছিল ৯.২০ কোটি। আর সেই বছরই ভোটার লিস্টে নাম ছিল মোট ৫.৬৩ কোটি মানুষের। অর্থাৎ জনসংখ্যার ৬১.১৯% ছিলেন ভোটার। খুব অস্বাভাবিক লাগছে কি? তার মানে জাল ভোটারের সংখ্যাটা কখনই মাত্রাছাড়া হয় না। সেই ত্রুটিকে স্বীকার করে নিয়েই এত বছর ভোট হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীই বলুন আর মুখ্যমন্ত্রী, তারা ক্ষমতা ভোগ করেছেন।

কিন্তু নাগরিকত্বের একটা প্রমাণপত্র থাকা কি খুব জরুরি নয়?

এত বছর ধরে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণপত্র ছাড়াই কোটি কোটি ভারতীয় তাদের জীবন কাটিয়ে গেছেন। তাদের কারও কোনো অসুবিধা হয়নি। নাগরিকত্বের প্রত্যক্ষ প্রমাণপত্র থাকলে কী কী বাড়তি সুবিধা হবে, সেটাই তো জানা নেই আমাদের। ধরুন, নাগরিকদের সকলকে কি উপার্জনের ব্যবস্থা করে দেবেন সরকার? কিংবা সমস্ত কমবয়েসিদের বিনামূল্যে অন্তত স্নাতকস্তর পর্যন্ত পড়াশুনোর সুযোগ? না, সেই গ্যারান্টি কেউই দিচ্ছেন না। তাহলে প্রমাণপত্রের প্রয়োজন আসছে কেন? আসছে স্রেফ রাজনৈতিক তাগিদে। এটাই আপত্তির কারণ। যদি আজ সরকার ঘোষণা করেন, সমস্ত বৈধ নাগরিককে যাবতীয় সামাজিক সুরক্ষা (উপার্জন, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি)-র ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে, তাহলে প্রমাণপত্রের কথাটা ভাবা যেতে পারত। কিন্তু তেমন তো কোনো কথা শোনা যাচ্ছে না!

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, NRIC-তে নাম থাকাটাই নাগরিকত্বের একমাত্র প্রমাণ। সেটা তো আর ভুল নয়!

ভুল, অবশ্যই ভুল। আমরা আগেই বলেছি, ভোটার কার্ড থাকা কিংবা ভোটার লিস্টে নাম থাকা মানেই নাগরিকত্বের প্রাথমিক প্রমাণ। সেটা বলেছি সংবিধানের ব্যাখ্যার মাধ্যমে। আজ কেউ বলতেই পারেন, NRIC-তে নাম থাকাই একমাত্র প্রমাণ।

কিন্তু সেই বিবৃতির পিছনে সংবিধানের কোনো সমর্থন নেই। NRIC ধারণাটা নাগরিকত্ব আইনে এসেছে ২০০৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে, যা বাস্তবে প্রয়োগ হয়েছে ২০০৪ সালের ৮ জানুয়ারি। তাহলে কি তার আগে ভারতীয় নাগরিকত্ব বলে কোনো বিষয় ছিল না? কিংবা অন্তত আজকের দিন পর্যন্ত NRIC নেই। তাহলে তো বলা উচিৎ, আজ পর্যন্ত ভারতে একজনও সন্দেহাতীতভাবে ভারতীয় নাগরিক নেই। এমনকি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতিও নন। তাহলে?

আর সবথেকে বড় কথা, NRIC-ও একটি তালিকা, ভোটার লিস্টের মতই। সেই তালিকাতেও ভুল থাকতে পারে। পারে কেন, থাকবেই। তার একটা কারণ মানবিক ত্রুটি। আর একটা কারণ আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব। মানবিক ত্রুটির হার আপনি কমিয়ে আনতে পারেন বারবার খতিয়ে দেখে। কিন্তু কখনই শূন্য করতে পারবেন না। আসামের কথাই ধরুন। আসামের সাম্প্রতিক NRC-তে ১৯ লক্ষ মানুষের নাম নেই। এর পরেও অজস্র ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’র নাম তালিকায় উঠেছে বলে অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। তাহলে? তাহলে তো আসামের NRC-ও আসামের অধিবাসী নাগরিকদের সঠিক তালিকা নয়।

যদি শেষ পর্যন্ত NRIC হয়, সেখানেও এমন ত্রুটি যে থাকবেই, চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়। তার উপর আরেকটা বিষয় আছে। এই তালিকা প্রস্তুতির জন্য যেসব তথ্য বা নথি চাওয়া হবে, ভারতবর্ষের কতজন মানুষের কাছে সেগুলো আছে? বাবামায়ের কথা বাদ দিন, ক’জন ভারতীয় নাগরিক নিজের জন্মতারিখ জানেন?

ছত্তিসগড়ের মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, NRIC হলে তাঁর রাজ্যের অন্তত অর্ধেক আদিবাসী মানুষের নাম বাদ যাবে, কারণ তাদের জমি নেই, কোনো নথি নেই। এদের সামলানো যাবে?

NRIC-তে নাম থাকাই যদি নাগরিকত্বের একমাত্র প্রমাণ হয়, তাহলে যারা সেই কাজ করবেন, তাদের নাগরিকত্ব তো আগে নির্ধারণ করতে হবে। সেটা করবে কে? হাওয়ায় কথা ছুঁড়ে দিয়ে রাজনীতিকের দিন চলে যায়, সাধারণ মানুষের চলে না।

সবথেকে বড় কথা, NRIC-তে নাম থাকাটাই যে নাগরিকত্বের প্রমাণ, সেটাই বা ঠিক করে দিল কে? সংবিধান বা নাগরিকত্ব আইনে এমন কোনো কথা বলা নেই। হ্যাঁ, তালিকাটা যেহেতু নাগরিকদের, তাই সেখানে নাম উঠলে নাগরিকের স্বীকৃতি প্রাথমিকভাবে মেলারই কথা।

কিন্তু সেটা তো ভোটার লিস্টের ক্ষেত্রেও সত্যি। তাহলে? আর ভোটার লিস্টের যদি স্বীকৃতি না থাকে, তাহলে NRIC-র স্বীকৃতির প্রশ্ন আসবে কেন? আসলে ভুল যে কোন তালিকাতেই থাকতে পারে। তাই আজ যদি NRIC-তে নাম ওঠে, কাল বাদও চলে যেতে পারে। ধ্রুব সত্যি বলে কিচ্ছু নেই, অন্তত আইনের চোখে।

সেনসাস, NPR এবং NRIC, এদের মধ্যে পার্থক্য কী?

সেনসাস মানে হল জনগণনা। সেখানে ভারতে নাগরিক-অনাগরিক নির্বিশেষে অন্ততপক্ষে ছয় মাস নির্দিষ্ট ঠিকানায় বসবাসকারীদের নাম ও বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়। যেমন নাম, বাবামায়ের নাম, লিঙ্গ, জন্মতারিখ, শিক্ষা, পেশা ইত্যাদি। এগুলোকে একসঙ্গে বলা হয় Demographic Information অর্থাৎ জনবিন্যাসগত তথ্য। ভারতে প্রথম সেনসাস হয়েছিল ১৮৯১ সালে। তারপর থেকে প্রতি দশ বছর পরপর সেনসাস হয়ে আসছে।

NPR-এর পুরো কথা হল National Population Register। নাগরিকত্ব আইনে এমন কোনো সংস্থান নেই। আছে ২০০৪ সালের The Citizenship (Registration of Citizens and Issue of national Identity Cards) Rules-এ। মূল আইন অর্থাৎ Act-এ যে ধারণা নেই, Rules অর্থাৎ বিধিতে তাকে আমদানি করা আইনসঙ্গত নয়। সে বিষয়ে পরে আলোচনা করা যাবে।

যাই হোক, মূল আলোচনায় আসি। সেনসাসের সঙ্গে NPR-এর মিল আছে এই অর্থে যে উভয় ক্ষেত্রেই Demographic Information সংগ্রহ করার কথা। কিন্তু সেনসাসের সঙ্গে NPR পৃথক হয়ে যায় দ্বিতীয় ধাপে।

NPR-এ একই সঙ্গে Biometric Information সংগ্রহ করা হবে বলে এই বিষয়ের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ Registrar General and Census Commissioner of India-র ওয়েবসাইটে বলা আছে। Biometric Information বলতে বোঝায় উচ্চতা, গায়ের রঙ, হাতের আঙুলের ছাপ, চোখের মনির রঙ ইত্যাদি। এগুলো আপনার শারীরিক পরিচিতির চিহ্ন।

সাধারণত অপরাধীদের ক্ষেত্রে এমন বিস্তৃত শারীরিক বিবরণ নথিবদ্ধ করা হয়ে থাকে জেলখানায়। পুলিশও দাগী অপরাধীদের শারীরিক বিবরণ নথিভূক্ত করে রাখে। পাছে তারা কেউ আইনের নজর এড়িয়ে পালিয়ে যায়, তার জন্যই এমন বন্দোবস্ত।

তার মানে দাঁড়াচ্ছে, নাগরিকত্ব আইনের ২০০৩ সালের সংশোধন বাস্তবত প্রতিটি ভারতবাসীকেই অপরাধী বলে ধরে নিয়েছে। তাই তাদের খুঁটিনাটি শারীরিক বিবরণ সংগ্রহের জন্য সরকার উদ্গ্রীব হয়ে পড়েছিলেন। এক্ষেত্রে একটা কথা অবশ্য মাথায় রাখতে হবে। মনে করে দেখুন, আধার কার্ডে নাম তোলার সময় আমরা সকলেই এমন সব তথ্য যেচে সরকারের হাতে তুলে দিয়েছি।

কাজেই NPR-এর সময় সম্ভবত নতুন করে মাপজোক হবে না। শুধু আপনার আধার কার্ডের নম্বর নিয়ে নেওয়া হবে।
NRIC-কে বলা হয় National Register of Indian Citizens। এই ধারণাটিও ২০০৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমেই নাগরিকত্ব আইনে এসেছে। এই তালিকায় কেবল ভারতীয় নাগরিকদের নাম, বাবামায়ের নাম, জন্ম তারিখ ও স্থান, ঠিকানা, বিয়ে হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে স্বামী অথবা স্ত্রী-র নাম, আইডেন্টিফিকেশন মার্ক থাকার কথা।

বাকি তিনটে তথ্য সরকারি দপ্তর দেবে অর্থাৎ নাগরিকের রেজিস্ট্রেশনের নং ও তারিখ এবং National Identity Number। অন্তত ২০০৩ সালের The Citizenship (Registration of Citizens and Issue of national Identity Cards) Rules-এর ৩(৩) বিধিতে তেমনটাই বলা আছে।

কেন্দ্রিয় সরকার বলছেন NPR এবং NRIC-র মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই। তাহলে NPR-এ আপত্তি কী?

যে বা যারাই বলুন NPR এবং NRIC-র মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই, তারা হয় বিষয়টা জানেন না, অথবা ইচ্ছে করেই মিথ্যে বলছেন। ২০০৩ সালের The Citizenship (Registration of Citizens and Issue of national Identity Cards) Rules-এর ৪(৩) বিধিতে বলা হয়েছে অঞ্চলভিত্তিক নাগরিক তালিকা (Local Register of Indian Citizens) প্রস্তুতির আঞ্চলিক প্রবন্ধক (Local Registrar) NPR-এর মাধ্যমে সংগৃহীত প্রতিটি পরিবার ও ব্যক্তির তথ্য যাচাই করবেন।

অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে ২০০৩ সালের বিধি অনুযায়ী NPR হল NRIC-র প্রথম ধাপ। আইন এমনটাই বলছে। কে কোথায় কী বলছেন, তিনি যেই হোন না কেন, তাতে বাস্তবতা বদলায় না। সবথেকে বড় কথা, নাগরিকত্ব বা নাগরিকদের তালিকা একটি আইনি বিষয়।

কোর্টে গিয়ে আপনি কোনো ব্যক্তি, তা তিনি যত বড় হনু-ই হোন না কেন, তার মুখের কথাকে ভিত্তি করতে পারবেন না। কোর্ট আপনার কাছে আইনি বয়ান চাইবে। যারা এমনটা বলছেন, বে-কায়দায় পড়ে ইচ্ছে করেই মিথ্যে বলছেন মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য।

একবার যদি NPR করে ফেলা যায়, NRIC হয়ে যাবে আপনার অগোচরে। তালিকা থেকে বাদ চলে যাবার পরেই আপনি জানতে পারবেন নোটিশের মাধ্যমে।

কেন্দ্রিয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, NPR-এ বাবামায়ের জন্মতারিখ ও জন্মস্থান জানতে চাওয়া হবে। সেটা ত অন্যায় নয়। সরকার এমন তথ্য চাইতে পারে না?

সরকারের ইচ্ছে হলেই চাইতে পারে। কিন্তু সেই চাওয়াটা হতে হবে কোনো একটা আইনের ভিত্তিতে। আজ যদি সরকারের ইচ্ছে হয়, আপনি সারা জীবনে কয়টি প্রেম করেছেন, সেই তথ্য জানতে চাইতেই পারেন। কিন্তু তার আগে ব্যক্তিগত তথ্য সরকারকে দিতে নাগরিকেরা বাধ্য, এমন আইন আনতে হবে এবং তাকে সংবিধানের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ হতে হবে।

NPR-এর ক্ষেত্রেও সেটি সমানভাবে সত্য। সরকার কতটুকু তথ্য চাইতে পারে, তার পরিসীমা নির্দিষ্ট করা আছে সংশ্লিষ্ট Rules-এ। সেখানে Demographic Information ও Biometric Information-এর কথা বলা হয়েছে। Registrar General and Census Commissioner of India-র ওয়েবসাইটও সেই কথা বলছে।
Biometric Information বলতে কী বোঝায়, সেটা আমরা দেখেছি।

বাবামায়ের জন্মের তারিখ ও জন্মস্থান তার মধ্যে পড়ে না। হ্যাঁ, বাবামায়ের জৈবিক উত্তরাধিকার অর্থাৎ জিনগত উত্তরাধিকার আমরা বহন করি। কিন্তু তার সঙ্গে বাবামায়ের জন্মস্থানের কোন সম্পর্ক নেই। আমার বাবা যদি কুড়ি বছর আগে বা পরে জন্মাতেন কিংবা ভারতের বদলে ঘটনাচক্রে ইস্তাম্বুলে জন্মাতেন, তাহলেও তার জিনগত উত্তরাধিকার আমি একইভাবে বহন করতাম। আসলে এখানে একটা অসদুদ্দেশ্য কাজ করছে। বাবামায়ের জন্মতারিখ ও জন্মস্থানের প্রসঙ্গ তুলে নাগরিকদের নাগরিকত্বের প্রসঙ্গকে ঘোলাটে করে দেবার একটা চালাকি কাজ করছে এখানে।

খুব সহজ কথা। যে দেশের অর্ধেক মানুষ নিজেদের জন্মতারিখ জানেন না, তারা তাদের বাবামায়ের জন্মতারিখ জানাবেন কোত্থেকে? তাহলে আগাম মৃত্যুদিন জানিয়ে দিতেই বা অসুবিধা কোথায়? দ্বিতীয়ত, আমার সম্পর্কে যে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তার এক্তিয়ার কেবল আমাকে নিয়েই। হ্যাঁ, আমার বাহ্য পরিচিতির ক্ষেত্রে আমার বাবামায়ের নাম জরুরী। কিন্তু ঐ পর্যন্তই।

আমার বাবামায়ের নিতান্ত ব্যক্তিগত তথ্য যে আমাকে জানতেই হবে, এমন দাবী কোন সুস্থ মানুষ করতে পারে না, কেবল চক্রান্তকারীরাই পারে। ধরা যাক, একটি মানুষ, যিনি জন্মের পরই পরিত্যক্ত হয়েছেন। তাহলে তো তার স্বাভাবিক পিতামাতার সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। কে বলতে পারে, সেই মানুষটির প্রকৃত বাবামা আসলে ভিনদেশি ছিলেন না?

এবং ১৯৮৭-র ১ জুলাই বা তারপরে তার জন্ম যদি ভারতে হয়েও থাকে, তাহলেও তার বাবা অথবা মায়ের ভারতীয় নাগরিক হওয়াটা অত্যাবশ্যক। নাহলে সেই শিশু ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবে না। তাহলে?
স্পষ্ট কথা, আমার বাবামায়ের নাম ছাড়া তাদের সম্পর্কে অন্য কোন তথ্য আমার নাই জানা থাকতে পারে। তেমন কোনো নথিও আমার কাছে নাই থাকতে পারে। সব থেকে বড় কথা, নাগরিকত্ব আইনে যে প্রশ্ন নেই, এমনকি Rules-এও নেই, সেই তথ্য সরবরাহ করতে আমাকে কেউ বাধ্য করতে পারে না।

সরকারের কাছে দেশের অধিবাসী বা নাগরিকদের একটা বিস্তারিত তালিকা থাকা কি অন্যায়?

সাধারণভাবে দেখলে এর মধ্যে অন্যায়ের কিছু নেই। কিন্তু যখন সেই তালিকা নিয়ে চোখ রাঙানো হয়, বারবার মথ্যে বলা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ জাগে। এখানে একটা কথা মাথায় রাখতে হবে। NRIC শব্দটা নাগরিকত্ব আইনে ঢোকানো হয়েছিল ২০০৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে। ২০০৪ সালের ৮ জানুয়ারি সেই সংশোধনী প্রযুক্ত হয়েছিল। কিন্তু ২০১৯ পর্যন্ত NRIC নিয়ে একটি কথাও কেউ উচ্চারণ করেনি। আসামে NRC সম্প্রসারণ হওয়ার পর আকাশ থেকে আচমকাই শব্দতাকে টেনে নামানো হল। সেক্ষেত্রে তবু আইনি বাধ্যতা প্রসঙ্গকে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু NPR?

আমরা আগেই দেখেছি নাগরিকত্ব আইনে NPR নেই, আছে NRIC। ২০০৩ সালের সংশোধনীর ভিত্তিতে জারি হওয়া The Citizenship (Registration of Citizens and Issue of national Identity Cards) Rules-এই শব্দটা এসেছে। তাও NPR বলে নয়, Population Register হিসাবে। ধরে নিলাম সেটার মাধ্যমে NPR-কেই বোঝানো হয়েছে। সেক্ষেত্রেও একটা সন্দেহ আছে। Rules-এর ৩ নং বিধির শিরোনাম হল National Register of Indian Citizens। সেখানে ৩(৪) উপধারায় অকস্মাৎ বলা হল, অঞ্চলের সমস্ত অধিবাসীর তথ্য সংগ্রহ করে ‘Population Register’ প্রণয়নের জন্য কেন্দ্রিয় সরকার নির্দেশ জারি করতে পারে।

আবার ৪(৩) উপধারায় বলা হয়েছে ভারতীয় নাগরিকদের অঞ্চলভিত্তিক তালিকা প্রস্তুতির জন্য আঞ্চলিক প্রবন্ধক Population Register-এ সংগৃহীত প্রতিটি পরিবার ও ব্যক্তি-র তথ্য যাচাই করে দেখবেন।

সেক্ষেত্রে NPR হল NRIC-র প্রাথমিক ধাপ যেখানে জনগণের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। Act অর্থাৎ আইনে যে সংস্থান নেই, তার ভিত্তিতে কোনো আইনি বন্দোবস্ত নেওয়া যায় না। সেটা অসাংবিধানিক। তাহলে সরকারকে প্রথমে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে NPR-কে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তা না হলে NPR-এ অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক, সরকারের এই ঘোষণাটিই হতে দাঁড়াবে মূল্যহীন।

কিন্তু এটা তো মানবেন, দেশে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী প্রচুর পরিমাণে আছে। এদের তাড়াতে পারলে উন্নয়নমূলক কাজের সুফল আমরাই পাব।

অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বিশ্বের সমস্ত দেশেই আছে। সম্প্রতি জানা গেল, বৃটেন নাকি এক লক্ষ ভারতীয়কে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করেছে। তাদের ফেরত নেবার জন্য ভারত সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে চেয়েছিল। ভারত সরকার নানা অছিলায় সেই চুক্তি স্বাক্ষর পিছিয়ে দিয়েছে।

তাহলে কি ভারতবাসী মানেই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী? নিশ্চয়ই নয়। ভারতেও অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আছেন। সংখ্যাটা সঠিক কত, দায়িত্ব নিয়ে কেউ বলতে পারবেন না। কেউ বলেন দু কোটি, কেউ বলছেন দশ কোটি। যার হজমের ক্ষমতা যেমন, তিনি তেমনটাই বিশ্বাস করেন। সরকারি পরিসংখ্যান কি আছে? সম্ভবত নেই। প্রতিটি সেনসাসেই প্রতিটি ব্যক্তিকেই নাগরিক নাকি বিদেশী, চিহ্নিত করার কথা।

২০০১ সালের সেনসাস রিপোর্টে বলা হয়েছিল প্রায় ৩১ লক্ষ মানুষ বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছেন। পরবর্তীকালের সেনসাস রিপোর্ট থেকে এই জাতীয় কোন তথ্য পাবার উপায় নেই।
তাহলে দু-দশ কোটির গল্প কোথায় গেল?

আসামের কথাই ধরুন। NRC-র আগে আসামের নেতারা বারবার বলতেন আসামে নাকি এক কোটি অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী আছে। NRC-র খসড়া তালিকায় ৩৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেল। চূড়ান্ত তালিকায় বাদ গেল ১৯ লক্ষের নাম।

যদি ধরেই নেওয়া যায়, এরা সকলেই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, তাহলেও গুজবের তুলনায় বাস্তবতাটা যে কতটা কম, সেটা বোঝা যাচ্ছে। মাথায় রাখতে হবে, ভারত কিন্তু জাতি সঙ্ঘের ১৯৫১ সালে রিফিউজি কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি।

ফলে ভারতে বৈদেশিক শরনার্থী কিংবা আশ্রয়প্রার্থীর ধারণার আইনি অস্তিত্ব নেই। তাই হয় আপনি নাগরিক, অথবা বৈধ কিংবা অবৈধভাবে আসা বিদেশী, এটাই আপনার আইনি পরিচিতি।
উন্নয়নমূলক কাজের সুফল তো খুব আশাপ্রদ খবর।

কিন্তু গত ৫ বছরে ঠিক কোন কোন জনহিতকর প্রকল্প অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বাহুল্যের জন্য ব্যর্থ হয়েছে, সেটা কি কেউ বলতে পারবেন? কাজেই যা হয়নি, সেই অনাগত আগামীর গল্প দিয়ে এক্ষেত্রে পার পাবার রাস্তা নেই।

কিন্তু এটা তো মানবেন, নাগরিকত্ব আইনে সাম্প্রতিক সংশোধন এনে সরকার এইসব অসহায় মানুষদের নাগরিকত্ব দেবার রাস্তা করে দিয়েছেন? সেটা কি ভালো নয়?

ভালো কিংবা মন্দ, বিচার করার জন্য সংশোধনীটিকে ভাল করে খুঁটিয়ে পড়ে দেখা দরকার। এই সংশোধনীতে নাকি আফগানিস্থান, পাকিস্থান ও বাংলাদেশ থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪-র আগে ভারতে চলে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর তালিকা থেকে বাদ দেবার কথা বলা হয়েছে। যারা এমন বলেন, তারা হয় আইনটা পড়ে দেখেননি, অথবা ইচ্ছাকৃত মিথ্যে কথা বলছেন। খুব স্পষ্ট ভাষাতেই বলা যাক, সাম্প্রতিক সংশোধনী যা CAA 2019 নামে পরিচিত, তাতে এমন কোনো কথা বলা হয়নি। চমকে গেলেন? তাহলে আসুন, একবার দেখা যাক।

হ্যাঁ, এই সংশোধনীর ২ নং ধারার শুরুতে এমন সব মানুষদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সত্য। কিন্তু তাদের বিবরণী সেখানেই থেমে যায়নি। একই সঙ্গে বলা হয়েছে এবং যাদের Passport (Entry Into India) Act, 1920 কিংবা Foreigners Act, 1946-এর প্রয়োগ থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছে, তাদেরই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাহলে সেই দুটো আইন একবার দেখে নিতে হয়।

দুটো আইনেই ২০১৫ সালে কেন্দ্রিয় সরকার নির্দেশ জারি করে পাকিস্থান ও বাংলাদেশ থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪-র আগে ধর্মীয় নিপীড়নের কারনে কিংবা তার ভয়ে ভারতে চলে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা থেকে রেহাই দিয়েছেন।

তাহলে কোন কোন শর্তের ভিত্তিতে একজন মানুষ অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সংজ্ঞা থেকে রেহাই পেতে পারেন?

১) তাকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪-র আগে আফগানিস্থান, পাকিস্থান বা বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসতে হবে ও তাকে সেই দেশের হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্শি অথবা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে (CAA 2019 অনুযায়ী),

এবং

২) Passport (Entry Into India) Act, 1920 কিংবা Foreigners Act, 1946-এর প্রয়োগ থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে অথবা সেই ভয়ে যিনি পাকিস্থান বা বাংলাদেশ থেকে এসে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।

বোঝাই যাচ্ছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শর্তকে একসঙ্গে বিচার করতে হবে। কারণ তাদের ‘এবং’ শব্দ দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে, ‘অথবা’ দিয়ে নয়।

তাহলে কী দাঁড়াল?

প্রথমত CAA 2019-এ আফগানিস্থানের কথা বলা হলেও অন্য দুটো আইনে বলা হয়নি। কাজেই আফগানিস্থান থেকে যদি ৫কেউ এসে থাকেন, তিনি এমনিতেই বাদ। এমন নিজে থেকেই নিজের সংজ্ঞাকে বাতিল (Self-excluding) করে দেওয়া আইন সম্ভবত এর আগে দেখা যায়নি। যাই হোক, আর এগোনো যাক।

পাসপোর্ট আর ফরেনার্স আইনে স্পষ্ট ভাষাতে ধর্মীয় নিপীড়নের কারনে কিংবা সেই আশঙ্কায় চলে আসার কথা বলা হয়েছে। সেটা প্রমাণ করবেন কিভাবে? আপনি পাকিস্থান বা বাংলাদেশের হিন্দু বা বৌদ্ধ বা অন্য চারটি ধর্ম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত মানুষ। ৩১.১২.২০১৪-র আগে আপনি ভারতে চলে এসেছেন। সবই ঠিক।

কিন্তু আপনি যে নিতান্ত অপরাধ করে যাতে শাস্তি না পেতে হয় সেই জন্য পালিয়ে আসেননি, তার প্রমাণ কী? ধর্মীয় নিপীড়নের কারণেই যে পালিয়ে এসেছেন, সেটাই বা প্রমাণ হবে কীভাবে? সেই দেশে কি আপনি এমন মর্মে থানায় কিংবা অন্য কোথাও কোনো অভিযোগ করেছিলেন?

একটা কথা খুব পরিস্কার। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস আছে, অবশ্যই আছে। কিন্তু পাকিস্থান বা বাংলাদেশের কোনো থানা কি সেই মর্মে লিখিত অভিযোগ নেবে? ভারতের কোনো থানা নেয়? আপনি অভিযোগ করতে পারেন, আপনার উপর আক্রমণ করা হয়েছে, আপনার বাড়িতে লুঠ করা হয়েছে, আপনাকে ভয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু সেগুলো যে ধর্মীয় বিদ্বেষের কারনেই, তার কোনো প্রমাণ আছে? কথাগুলো আমার নয়।

CAA 2019 –এর আগে ২০১৬ সালেও এই মর্মে আইন সংশোধনের প্রস্তাব লোকসভায় পাশ হয়েছিল। রাজ্যসভা সেটাকে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠায়। ২০১৮ সালে সিলেক্ট কমিটি আই বি-র ডি জি-কে দেকে পাঠান। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, এই সংশোধনীর বলে কতজন নাগরিকত্ব পেতে পারেন। ডি জি স্পষ্ট উত্তর দিয়েছিলেন, সংখ্যাটা হল ৩১,৩৪২।

তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এই সংশোধনীর সুযোগ যারা নেবেন, তারা যে সত্যি সত্যিই ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার, সেটা প্রমাণ হবে কিভাবে। আই বি-র ডি জি উত্তর দিয়েছিলেন, যারা ভারতে আসার সময় এমন কথা বলেননি, তাদের ক্ষেত্রে কিভাবে প্রমাণ হবে, তার জানা নেই।

হয়তো ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW-র সাহায্য লাগবে।
তার মানে, বিষয়টা যত সহজ ভাবছেন, তেমনটা আদপেই নয়। আপনি হয়তো আবেদন করলেন। কিন্তু যতক্ষণ না সরকার সন্দিহান হচ্ছেন ধর্মীয় নিপীড়নের কারনেই আপনি স্বদেশ ছেড়ে ভারতে চলে এসেছেন, ততদিন আপনার নাগরিকত্ব জুটবে না।

আর সেক্ষেত্রে আপনি নিজেই ঘোষণা করে দিয়েছেন যে আপনি বহিরাগত। ধর্মীয় নিপীড়নের বাস্তব প্রমাণ না থাকলে আপনার অবস্থা আরো সঙ্গিন। হয়তো ইতিমধ্যে আপনি ভোটার লিস্টে নাম তুলে ফেলেছেন, আধার কার্ড বা প্যান কার্ড-ও সংগ্রহ করেছেন। বানিয়ে ফেলেছেন নিজের আস্তানা, সাজিয়ে ফেলেছেন ব্যবসা।

যদি এগুলো করে থাকেন, তাহলে আপনার আবেদনই প্রমাণ করে দেবে, আপনি তথ্য গোপন করে সরকারের কাছে নিজেকে নথিভুক্ত করেছেন, যা দণ্ডনীয় অপরাধ। ভাবুন, ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন।

যাই হোক না কেন, আইন তো পাশ হয়ে গেছে। তাহলে আর ভেবে লাভ কী?

ভারতের সংসদ কিংবা কোন বিধানসভায় গৃহীত কোন আইনকে অতি-অবশ্যই সংবিধানের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ হতে হবে। ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নং অনুচ্ছেদ ঘোষণা করেছে, ‘আইনের ক্ষেত্রে সাম্যের অধিকার থেকে অথবা ভারতের সীমানার মধ্যে আইনের সমান সুরক্ষা থেকে রাষ্ট্র কোনো মানুষকেই প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না। ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা জন্মস্থানের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কোনো বৈষম্য করতে পারবে না’।

স্পষ্টতই CAA 2019 সংবিধানের ১৪ নং অনুচ্ছেদকে লঙ্ঘন করেছে, ধর্ম ও জন্মস্থানের ভিত্তিতে বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলে। ফলে এই সংশোধনী সংবিধানবিরোধী। আমাদের দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা অনুযায়ী সংবিধানের স্থান সবার উপরে। কাজেই মাথা ঘামাতেই হবে।

নিজস্ব প্রতিনিধি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *