কিছু স্মৃতি কিছু কথা

বন্দনা সাহা,,,,,,,,
১৭/০৯/২০২০

আজ এক অনন্য দিবস। বিশ্বকর্মা পুজো ও মহালয়া একই তিথিতে অনুষ্ঠিত হলো । আরও একমাস বাদে উমা মায়ের আগমন ঘটবে এই ধরায় ।বিশ্বকর্মা পুজোর দিনই পিতৃপুরুষের তর্পণ,তার একমাস বাদে,দেবী পক্ষের সূচনা। যা হয়ত, পুরাণ তথা পঞ্জিকার ইতিহাসে এই প্রথম।
আজ পৃথিবীতে অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে ।এই বদল হয়তো বা আরো বড় কোন পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে; কে জানে? একমাত্র সময়়ই তা বলতে পারবে। বর্তমান সময়ে, করোনা মহামারী উদ্ভুত সমস্যার কারনে,বিশ্বকর্মা পুজো তেমন ভাবে হয় নি। এই ছবিটা যদিও একটু অপরিচিত ,কিন্তু শহরের আলিতে ,গলিতে মহা ধুমধাম সহকারে এই পুুুজো পালিত হয় থাকে ।মাইকের তারস্বর আওয়াজে ঘরের অন্দরে বাস করা দায় হয়ে ওঠে ।
আমি এখন একজন প্রবীনা। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন এত বিশ্বকর্মা পুজোর ছড়াছড়ি ছিল না । বড় বড় কলকারখানা গুলিতেই এই পুজো পালিত হতো ।পথে হয়ত বা দুই একটি বিশ্বকর্মা ঠাকুরের দেখা মিলত। ছিল না এত ভোগ রাগ বা খিচুড়ি খাওয়ার আয়োজন। ঠাকুর বিশ্বকর্মার অনেক যত্ন হয়, কিন্তু আসল বিশ্বকর্মাদের ভাগ্যে জোটে পদধূলি ।
এই পুজোর প্রধান আকর্ষন ছিল ঘুড়ি ওড়ানো ।
দোকানে দোকানে ঘুড়ি, লাটাই,সুতোর পসরা সাজিয়ে বসতেন দোকানিরা । পেটকাটি, চাঁদিয়াল,মুখপোড়া, চৌরঙ্গী,ল্যাজওয়ালা ইত্যাদি ছিল কয়েকটি নামকরা ঘুড়ি । এদিন সকাল থেকেই আকাশ যেত ঘুড়িতে ঘুড়িতে ছেয়ে । তখন ছিল না, চীনা মাঞ্জা ; যারা ঘুড়ি ওড়ানোয় অনেক বেশী সৌখিন ছিলেন,তারা এই পুজোর কয়েকদিন আগে থেকেই বাড়ীতে দেশীয় পদ্ধতিতে সুতোয় ধারালো করে মাঞ্জা দিতেন ,যাতে প্রতিপক্ষের ঘুড়িটি সহজেই কাটা যায় । ঘুড়ির কাটাকুটি খেলা ছিল এক মজার খেলা। কে,কত ভালো ঘুড়ি ওড়াতে পারেন, তার দক্ষ্তার প্রমাণ মিলতো, তিনি কতগুলি ঘুড়ি কাটতে পারলেন। সুতোয় ভরা লাটাই টি ধরা থাকতো তার নিজস্ব সাগরেদের হাতে ।দারুন দক্ষ্তায় সেও সুতো ছেড়ে দিত আকাশে ঘুড়ির খেলার মাতনে ।
আমরা দেখতাম,আমাদের বাবা,জ্যাঠামশাই, খুড়ো মশাইয়েরা (তখন তারা ছিলেন বয়েসে তরুণ)
এই দিন ঘুড়ি ওড়াবার সময়,ছাদে ঢাক,ঢোল,কাঁসর, ঘন্টা ,শঙ্খ হাতের সামনে রাখতেন। অপর পক্ষের ঘুড়িটি কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বাদ্যযন্ত্র গুলিকে সজোরে বাজাতেন আর ভো কাট্টা , ভো কাট্টা বলে চিৎকার করতেন । সারাদিন ধরে, নাওয়া খাওয়ার আর সময় থাকতো না তাঁদের ।
কিন্তু, আজ আকাশে। ঘুড়ি ওড়ার দৃশ্য বিরল । শহরে, গ্রামে গঞ্জে লেগেছে,আধুনিকতার ছোঁয়া ! শহরে বহুতলের সারি ও ওভার ব্রীজের আধিক্য নীল আকাশটাকে দিয়েছে ঢেকে । গ্রামে গঞ্জেও আজ একই অবস্থা । গৃহস্থের গৃহ নেই ; ছাদ নেই; মাঠ ময়দান নেই । সবই চলে যাচ্ছে, প্রোমোটারের গর্ভে । আগামী প্রজন্মের কাছে ক্যারিয়রের চিন্তা এত প্রবল যে, তারা বোধ হয়, এই সীমাহীন নীল আকাশটার দিকে তাকাতেও ভুলে গেছে । আকাশে ঘুরি ওড়ানো তো স্বপ্ন ঘোরের অলীক কল্পনা মাত্র।
ঘুড়ি এখন পুরনো চিন্তা ধারার প্রতীক । তাই প্রতীক হিসাবে বিশ্বকর্মা ঠাকুরের মুর্ত্তির হাতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় একটি ঘুড়ি । বাঙালি জীবনের অনেক শিল্প সংস্কৃতির মতো ঘুড়ি শিল্পও হয়তো তলিয়ে যাবে,কালের গর্ভে ।
এবার মহালয়ার কথা কিছু বলি । এই অভিশপ্ত করোনা আবহে মহালয়াও যেন এক অচেনা ছবি । এত নিষ্প্রাণ ,এত জৌলুশহীন মহলয়াও যেন কেউ এর আগে কখনো দেখেনি । অনেকেই পিতৃপুরুষের উদ্দ্যেশে তর্পণ করতে যেতে পারেন নি গঙ্গার ঘাটে ।
মহালয়ার দিনই হয়ে যায় দেবীপক্ষের সূচনা । এই তিথির প্রধান আকর্ষন হলো”বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের ” দরাজ কণ্ঠস্বরে দেবী দুর্গতি নাশিনীর চন্ডীপাঠ। তখন ছিল, রেডিওর যুগ । এখনকার টেলিভিশন সেটের মট প্রতি ঘরে রেডিও সেট থাকত। রেডিওটিকে অতি সযতনে সামনে রেখে,শিউলিফুল ফোটা ভোরে, হিম হিম আবহাওয়াতে, শাড়ীর রনগিন পাড়ের সুতো দিয়ে নানান লতা, পাতা,ফুল,ম্যুর ইত্যাদির নক্সা করা ,ঠাকুমার হতে সেলাই করা নকশিকাঁথা খানি গায়ে জড়িয়ে রেডিওতে শুনতাম”বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডী পাঠ” – “জাগো,,,দুর্গা ;জাগো দশপ্রহরন ধারিনী ।” তাঁর কন্ঠস্বরে র বিপুল ব্যাপ্তিতে শরীরে জেগে উঠতো শিহরন(যা এখনো জাগায়)। মনে হত- মা দুর্গা যেন স্বয়ং আমাদের দুয়ারে এসে উপস্থিত হয়েছেন ।
এখন সামাজিক প্রেক্ষাপটের আমূল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানব হৃদয়েরও অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। কনভেন্টে পড়াশুনার যুগে,সংস্কৃত ভাষাটা র আর তেমন দরকার পড়ে না । তাছাড়া, এখন রেডিওর জায়গা দখল করে নিয়েছে, টেলিভিশন আর মোবাইল । বাড়ীর শিশুরা ও সদস্যরাও এখন বোধ হয়,রেডিওতে ভোর সকালে চন্ডীপাঠ শোনার চাইতে টেলিভিশনের রঙ্গীন মহিষাসুর মর্দিনী অনুষ্ঠান দেখতেই বেশি পছন্দ করেন । ইউ টিউবে ই
এখন তাঁর গলায় চন্ডীপাঠ বছরের সকল সময়েই শুনতে পাওয়া যায় । তাই, অত ভোরে ঘুম থেকে ওঠার প্রয়োজনও পড়ে না । তবে, রেডিও মহালয়ার এই দিনের ঐতিহ্যটিকে পূর্ণ মর্যাদায় ধরে রেখেছে । ট্রানজিস্টরের ব্যবহার আর এখন তেমন নেই – হতে ধরা মুঠো ফোনটিই হল এখন বিশ্বায়নের প্রতীক । মহালয়া মানেই, পুজো এসে গেল । বাউল বৈরাগীর এসে দোরে দোরে শুনিয়ে যেতেন,”আগমনীর গান।” তখন আর পড়ায় মন বসত না মোটেই । গৃহ সংলগ্ন মাঠ গুলিতে যেখানে যেখানে পুজো হত, ছুটে গিয়ে দেখে আসতাম মায়ের মূর্তি কত খানি তৈরি হলো ! তোর যে,আর সইত না। কখন মা তাঁর সন্তান – সন্ততিদের নিয়ে সেজে গুজে পুজো মণ্ডপে এসে বসবেন – মনে থাকতো তার আকুল প্রতীক্ষা । তখন পুজো তিন দিনেরই হত। মাতা- পিতার দেওয়া নতুন জামাখানি গায়ে তুলে, প্রতিমা দর্শনে বেরতাম বাবার হাত ধরে । তখন এত থিমের পুজো হতো না । একচালা অথবা ডাকে র সাজের প্রতিমা ই ছিল প্রধান আকর্ষন ।
তখন পাশ্চাত্য সভ্যতার এত প্রভাব বাঙালি জীবনে পড়েনি । প্রতি ঘরে ঘরেই জীবন যাত্রা ছিল সাধারন ।পুজোর সময় অধিকাংশ সময়ে, কাছাকাছি দোকান থেকে ছিট কাপড় এনে, পারলে মা নিজেই বানিয়ে দিতেন পুজোর জামা এবং সেই জামা পাড়া প্রতিবেশীদের আনন্দ সহকারে দেখানো । শপিং মল কি হয়? আমাদের ছোটবেলায় টা ছিল অজানা ।
তবে,পরিবর্তন যতই আসুক, বিশ্বকর্মা পুজো, মহালয়া,দুর্গোৎসব ও আরও নানাবিধ উৎসবের আনন্দে বাঙালি মাতোয়ারা হবে সব সময় । নানান ধরনের ঝড় ঝাপটা,দুঃখ,কষ্ট,বাঙালি জীবনের নিত্য সঙ্গী – তবুও বাঙ্গালী সকল উৎসবে সামিল হতে জানে এবং সেই মহাজাগতিক আনন্দের আস্বাদ প্রাণভরে গ্রহন করতেও জানে । ।

                                       শ্রীমতী বন্দনা সাহা
                                             মুকুন্দ পুর, ।            
                                               কলকাতা ।
                                          ১৭/০৯/২০২০

বন্দনা সাহা

শ্রীমতি বন্দনা সাহা। (লেখিকা/শিশুসাহিত্যিক)। মুকুন্দ পুর, কলকাতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *